উন্নত ভবিষ্যৎ আর জীবিকার সন্ধানে মেগাসিটি ঢাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসে। এ জনস্রোতের একটি বড় অংশই তরুণ শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী ব্যাচেলর। কিন্তু শহরের আকাশছোঁয়া অট্টালিকার ভিড়ে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ‘ব্যাচেলর’ পরিচয়টি হয়ে ওঠে অলিখিত অপরাধ। বাসা খুঁজতে গিয়ে পদে পদে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়।
‘ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেয়া হবে না’
শহরের অলিগলিতে হাঁটলে দেয়ালে দেয়ালে অসংখ্য টু-লেট দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ বিজ্ঞাপনের নিচে ছোট করে একটি শর্ত লেখা থাকে— ‘শুধুমাত্র ফ্যামিলি’ অথবা ‘ব্যাচেলরদের জন্য নয়’। বাড়িওয়ালাদের একটি বড় অংশের ধারণা, ব্যাচেলর মানেই বিশৃঙ্খলা, উচ্চ শব্দে গান বাজানো কিংবা বাসায় আড্ডা। এ নেতিবাচক মানসিকতার কারণে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিজীবী বা মেধাবী শিক্ষার্থীকেও মাসের পর মাস রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয় একটি রুমের জন্য।
ব্যাচেলর হিসেবে বাসা ভাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের চ্যালেঞ্জগুলো আরো বহুমাত্রিক ও স্পর্শকাতর। একজন পুরুষ ব্যাচেলর বাসা খুঁজলে তাকে হয়তো ‘উচ্ছৃঙ্খল’ তকমা দেয়া হয়। কিন্তু একজন নারী একা বাসা ভাড়া নিতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে তার ‘চরিত্র’ নিয়ে। কেন তিনি একা থাকবেন? পরিবার কেন সাথে নেই? এমন হাজারো ব্যক্তিগত প্রশ্নে জর্জরিত হতে হয় ব্যাচেলর নারীকে।
নারীদের ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা বা প্রতিবেশীদের নজরদারি থাকে চরমে। কে আসছে, কী কাপড় পরছে, কখন বের হচ্ছে সবকিছু তীক্ষ্ণ নজরে বিচার করা হয়। এতে নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। অনেক সময় রান্নাঘর বা বাথরুম শেয়ার করতে গিয়ে বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন সাবলেটে থাকা নারীরা।
বাড়িওয়ালার কড়া শাসন ও চড়া ভাড়া
বাসা পাওয়া গেলেও ব্যাচেলরদের সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া গুণতে হয়। এছাড়া পানির বিল, গ্যাস বিল বা সিকিউরিটি বিলের নামে তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করার প্রবণতা তো আছেই। এরসঙ্গে আছে বিধিনিষেধের বেড়াজাল— রাত ১০টার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে, কোনো বন্ধু বা আত্মীয় আসতে পারবে না, ছাদে যাওয়া যাবে না, উচ্চস্বরে কথা বলা যাব না। নিজের টাকায় ভাড়া থেকেও ব্যাচেলরদের অনেকটা অনাত্মীয় মতো জীবন যাপন করতে হয়।
মেস লাইফ: গাদাগাদি করে বেঁচে থাকা
বাসা না পেয়ে অধিকাংশ ব্যাচেলরের শেষ ভরসা হয় ‘মেস’। একটি তিন রুমের ফ্ল্যাটে অনেক সময় ১০ থেকে ১২ জন মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করে। এক রুমে দুই-তিনজন করে বসবাস করা, কয়েকজন মিলে একটি বাথরুম ব্যবহার আর রান্না নিয়ে প্রতিদিনের অশান্তি মেস জীবনের চিরচেনা রূপ। এখানে ‘প্রাইভেসি’ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিলাসিতার নাম।
মেস জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ‘খাবার’। একই স্বাদের ডাল-ভর্তার একঘেয়েমি আর মাঝেমধ্যে বুয়ার অনুপস্থিতি পুরো মেসের সদস্যদের জীবন বিষিয়ে তোলে। মিলের হিসাব রাখা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা বাজারের টাকা নিয়ে মনোমালিন্য হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা।
সামাজিক ও মানসিক চাপ
আবাসন সংকটের এ লড়াই ব্যাচেলরদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ তৈরি করে। দিনের পর দিন স্বাচ্ছন্দ্যের বাসা খুঁজে না পেয়ে তারা নিজ শহরেই ‘অবাঞ্ছিত’ বোধ করে। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের অভাব তাদের পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাচেলরদের এ সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে পরিবর্তন প্রয়োজন:
- হোস্টেল কালচার: বড় শহরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরো বেশি আধুনিক হোস্টেল বা ডরমিটরি তৈরি করা।
- বাড়িওয়ালাদের মানসিকতা পরিবর্তন: ব্যাচেলরদের ঢালাওভাবে অপরাধী না ভেবে নিয়মমাফিক ভাড়ার আওতায় আনা।
- আইনি সুরক্ষা: ভাড়াটিয়া আইনে ব্যাচেলরদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বা এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা করা।










