রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। হুট করেই মাথায় চেপে বসল ঘোরার নেশা। মেসেঞ্জারে নক করলাম হানিফকে। লিখলাম, এখনই বাইক নিয়ে চলে আসো। সে ঠিকই চলে এল। আমি তাকে সোজা নিকলির পথে যেতে বললাম। আশুলিয়া বেড়িবাঁধ হয়ে মোটরবাইক চলছে। রাত গভীরেও মহা যানজট। গাজীপুর পৌঁছতেই বাসায় খবর হয়ে গেল। একে একে পরিবারের ছোট-বড় অনেকেই ফোন দিয়ে ফেরাতে চাইল। বাসায় কাউকে বলে যাইনি। এক কাপড়েই বের হয়ে গেছি। গাজীপুর চৌরাস্তা পার হয়ে খাস্তা পরোটা আর ডিম ভাজা দিয়ে রাতের খাবারটা সেরে নিলাম। এসব হোটেল যেন আমাদের মতো ভ্রমণ উন্মাদদের জন্যই খোলা রাখে। খাওয়া-দাওয়া শেষে বাইক স্টার্ট। রাতের নীরবতা ভেদ করে মোটরবাইক চলছে। চকচকে পিচের প্রশস্ত ফাঁকা রাস্তা। এক পসলা বৃষ্টি এসে রণে ভঙ্গ দেয়ার জন্য আক্রমণ করল। তবু থামাতে পারল না। হার মেনে বৃষ্টিই পালাল।
চলতে চলতে মহাসড়ক ছেড়ে, ডানে মোড় নিয়ে কাপাসিয়ার দিকে যাওয়া সড়কে চলছি। পথটা কেমন যেন ভৌতিক। দুইপাশে ঘন শালবন। মাঝে সরু সড়ক। রাত গভীরে গা ছমছম করা সুনসান নিরিবিলি পথ। অন্য রকম একটা অনুভূতি। যেতে যেতে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর করা ফকির মজনু শাহ্ সেতু পার হয়ে মিয়ার বাজারে ব্রেক। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। এক দোকানি রাত গভীরেও এ রকম গ্রাম্য জনপদে তার চায়ের পসরা নিয়ে বসে আছে। চা, বিস্কুট, পান চিবুতে চিবুতে আবারো ছুটে চলি নিকলীর পথে। এ পাশটায় বেওয়ারিশ কুকুরগুলো অনেক সভ্য। তেমন ঘেউ ঘেউ না করেই, ছুটে এসে আবার ফিরে যায়। প্রায় সুবহে সাদেকের সময় কিশোরগঞ্জের বিন্নাটির মোড়ে পৌঁছলাম। রাতজাগা দোকানিদের মুখ হতে নিকলী যাওয়ার সঠিক পথ জেনে নিয়ে এগোতে থাকি। অল্প সময়ের মধ্যেই পুলের ঘাট বাজারে পৌঁছলাম। ঠাণ্ডা পানি, বিস্কুট খেতে খেতে দোকানিদের সঙ্গে আলাপ জুড়ালাম। তারা এ সময় না যাওয়ার জন্য যেমন বলছে, আবার নিরাপত্তারও কোনো সমস্যা নেই, সে বিষয়েও অভয় দিচ্ছে। মানে ফিফটি ফিফটি। ওদিকে ফজরের আজান ও জামাত হতে আরো অনেক দেরি। ঘরের কাছে এসে কার মনে চায়, অযথাই সড়কের পাশে সময় কাটাতে। সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলাম, এগোবে নাকি? তার সোজা উত্তর তোমার ইচ্ছা। যেতে যেতেই ফজরের আজান। পথের পাশের এক মসজিদে নামাজ আদায় করেই স্পিড রাইড। নতুন করে শখ জেগেছে, নিকলী গিয়ে সূর্যোদয় দেখব। যেতে যেতে পথের সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে মাঝে মধ্যেই থমকে যাই। গ্রামবাংলার অসাধারণ নয়নাভিরাম রূপ যেন, নিকলীর পথের গ্রামগুলোর ওপর ভর করেছে। ভোরের আলোয় চেনা-অচেনা পাখির কলতান সঙ্গী করে বাইক চলে মন্থর গতিতে। পথের প্রেমে পড়ে সূর্যোদয়ের কথা ভুলেই যাই। নিকলী বেড়িবাঁধে যখন ঢুকি তখন মনে হলো, এ যেন অন্য আরেক জগৎ। যে জগতে শুধু প্রকৃতিরই বিচরণ। আমরা হলাম উদ্ভটের মতো অনাহূত আগন্তুক। উপজেলা পরিষদের ভবন পেছনে ফেলে আরো এগিয়ে যাই। একেবারে বেড়িবাঁধের শেষ পর্যন্ত। যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। সে এক অপরূপ দৃশ্য। হাওড়ের নাম নিকলী। কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যতম নয়নাভিরাম হাওড়। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অসাধারণ ভালো লাগার। নিকলী বেড়িবাঁধ, হাওড়ের নান্দনিকতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সঙ্গে যোগ হয়েছে জেলেদের মাছ ধরার কর্মযজ্ঞ। ভ্রমণপিপাসুরা ইচ্ছা করলে ছৈতোলা নৌকায় ভেসে বেড়াতে পারবেন। যাওয়া যাবে অথৈ পানির মাঝে ছোট্ট দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রামগুলোয়। হাওড়ের সূর্যোদয়-সূর্যাস্তর মনোরম দৃশ্য, সাগরতীর থেকে দেখার চেয়ে কম নয়। হিজল, করচ গাছগুলো টইটম্বুর পানির বুকে মাথা উঁচু করে জানান দেয়, শতপ্রতিকূলতার










