বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও নেতিবাচক খবরের চাপ অনেক সময় মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত করে তোলে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করলে এ প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থিতধী থাকা সম্ভব। সাম্প্রতিক গবেষণা ও মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন অনুসন্ধান থেকে এমন কয়েকটি কার্যকর পদ্ধতি তুলে ধরেছে বিবিসির বিজ্ঞান বিভাগ। অস্থির সময়ে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক এমন ৯টি উপায় নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।
১. অনুভূতির সুনির্দিষ্ট প্রকাশ
গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের অনুভূতিকে যত সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়, তার সঙ্গে মানিয়ে নেয়া তত সহজ হয়। অধিকাংশ মানুষই খারাপ লাগলে ঢালাওভাবে বলেন, তারা ‘চাপে’ আছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু ‘চাপ’ না বলে সেই অনুভূতিটি আসলে কী—তা চিহ্নিত করা জরুরি। সেটি কি নিছক বিরক্তি, দুশ্চিন্তা, ভয় নাকি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট? অনুভূতির এ সূক্ষ্ম স্তরগুলো বুঝতে পারলে শারীরিক ও মানসিক—উভয় স্বাস্থ্যেরই উন্নতি ঘটে। একে বলা হয় ‘ইমোশনাল গ্র্যানুলারিটি’।
অনেক সময় নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য আমরা মাতৃভাষায় সঠিক শব্দ খুঁজে পাই না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অন্য সংস্কৃতির এমন কিছু শব্দ শেখা আমাদের জন্য উপকারী হতে পারে, যেগুলোর সরাসরি কোনো অনুবাদ নেই। অর্থাৎ যত বেশি শব্দ দিয়ে আপনি আপনার মনের অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারবেন, আপনার মানসিক দৃঢ়তা ততটাই বৃদ্ধি পাবে।
২. উদ্বেগকে শক্তিতে রূপান্তর
‘অ্যাংজাইটি’ বা উদ্বেগের আক্ষরিক উৎস খুঁজলে প্রাচীন ল্যাটিন ও গ্রিক শব্দে এর অর্থ পাওয়া যায় ‘কণ্ঠরোধ’ বা ‘অস্বস্তি’। যারা প্যানিক অ্যাটাক বা তীব্র উদ্বেগের মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা এ নামকরণের সার্থকতা সহজেই বুঝবেন। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, উদ্বেগ বা ‘অ্যাংজাইটি’ মানেই খারাপ কিছু নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্বেগ একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে ‘ডিসঅর্ডার’ পর্যায়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত এটি অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। উদ্বেগের কারণে আমাদের মস্তিষ্ক আরো বেশি মনোযোগী ও দক্ষ হয়ে ওঠে। এটি আমাদের মাঝে পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক সংযোগ তৈরির তাড়না বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে আমাদের আরো সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী করে তোলে। তাই উদ্বেগকে বিপদের সংকেত হিসেবে না দেখে 'প্রস্তুতির সংকেত' হিসেবে দেখুন।
৩. গঠনমূলক দুশ্চিন্তা
যেহেতু দুশ্চিন্তা ভবিষ্যৎ কেন্দ্রিক, তাই একে সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী কেট সুইনির মতে, দুশ্চিন্তাকে জয় করার পদ্ধতি হলো: প্রথমে চিন্তার কারণটি চিহ্নিত করা, তারপর সমাধানের সম্ভাব্য কাজের তালিকা করা। যদি করণীয় কিছু না থাকে, তবে মাইন্ডফুলনেস বা ধ্যানের মাধ্যমে মনকে শান্ত করা।
৪. বই, সংগীত ও পরিবেশের প্রভাব
‘বিবলিওথেরাপি’ বা বইয়ের মাধ্যমে নিরাময় এখন বেশ জনপ্রিয়। মলাট খুললেই বই নিয়ে যেতে পারে ভিনদেশ বা অন্য কোনো জগতে। কেবল কল্পনাই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে—যারা নিয়মিত আনন্দের জন্য বই পড়েন, তারা অন্যদের তুলনায় কম মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও একাকীত্বে ভোগেন। এমনকি তাদের সামাজিক যোগাযোগ ও আত্মবিশ্বাসও থাকে অনেক বেশি। একইভাবে প্রিয় সংগীত তাৎক্ষণিকভাবে মন ভালো করতে পারে। এছাড়া নিজের চারপাশ গাছপালা বা প্রিয়জনের ছবি দিয়ে সাজিয়ে রাখলে তা মানসিক প্রশান্তি দেয়।
৫. হরর সিনেমা দেখার উপকারিতা
শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও, ভৌতিক সিনেমা অনেক সময় দুশ্চিন্তার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। নিজের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ভয়ের সিনেমা দেখা এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম, যা বাস্তব জীবনের বিপদ মোকাবেলার জন্য মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভয়ের গল্প বা সিনেমা পছন্দ করেন, তারা প্রতিকূল সময়ে অন্যদের চেয়ে বেশি শান্ত থাকেন।
৬. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
‘কাউন্ট ইয়োর ব্লেসিংস’ বা নিজের জীবনের প্রাপ্তিগুলোর হিসাব রাখাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘থ্রি গুড থিংস’ বা ‘গ্র্যাটিচিউড লিস্ট’ বলা হয়। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সারাদিনের অন্তত তিনটি ভালো ঘটনার কথা ডায়েরিতে লিখুন। ২০০৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রতিদিনের তিনটি ভালো লাগার বিষয় লিখে রেখেছেন, মাত্র এক মাস পর থেকেই তাদের মাঝে সুখের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে এবং বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো কমে এসেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এ ইতিবাচক প্রভাব গবেষণার পুরো ছয় মাসজুড়ে স্থায়ী হয়েছিল। অন্যদিকে, যারা কেবল নিজেদের সুখের মাত্রা মেপেছিলেন কিন্তু কোনো তালিকা করেননি, তাদের ভালো লাগার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৭. নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়ে মনোযোগ
প্রাচীন স্টোয়িক দার্শনিক এপিকটেটাস শিখিয়েছেন—জীবনে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে এবং যা নিয়ন্ত্রণে নেই , এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করতে শেখাই হলো প্রধান কাজ। অবাস্তব প্রত্যাশা বা অনিবার্য কোনো কিছুকে বাধা দেয়ার চেষ্টা থেকেই মানসিক কষ্টের জন্ম হয়। যা বদলানো সম্ভব নয়, তা মেনে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
৮. কর্মমুখী প্রত্যাশা
কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’—এমন অলীক আশা করা অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ ধরনের নিস্ক্রিয় আশাবাদ মানুষকে বাস্তব সমস্যা বা অনিশ্চয়তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় ও দায়িত্বহীন করে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, আশা তখনই কার্যকর হয় যখন তার সাথে কর্মতৎপরতা যুক্ত থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, লক্ষ্য নির্ধারণ ও সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর যাত্রাই মানুষের মনে প্রকৃত আশার সঞ্চার করে, যা প্রতিকূল সময়ে পথ দেখাতে সাহায্য করে।
৯. শিশুদের সঙ্গে প্রতিকূলতা নিয়ে আলোচনা
অস্থির সময় শিশুদের মনেও গভীর প্রভাব ফেলে। গবেষকরা বলছেন, শিশুদের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাদের প্রশ্ন করা ও তাদের আবেগগুলোকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। তাদের কষ্টের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে খোলামেলা আলোচনা করলে শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারা মানসিক চাপ সামলাতে শিখবে।
বিবিসি অবলম্বনে










