এক প্লেট বাসি ভাত, ঠিকমতো সেদ্ধ না হওয়া ডিম কিংবা অপরিষ্কার পানিতে বানানো শরবত— পরিমাণে অল্প হলেও খাবারগুলো মুহূর্তে মানুষকে অসুস্থ করতে পারে। খাদ্যে বিষক্রিয়া নামে পরিচিত হলেও, এটি এমন এক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা হঠাৎ শুরু হয়, তীব্রভাবে ভোগায়, আবার কয়েকঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে অবহেলা করলে এটি কখনো কখনো প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় খাদ্যে বিষক্রিয়াকে বলা হয় ফুডবর্ন ইলনেস। দূষিত, পচা বা বিষাক্ত খাবার খাওয়ার ফলেই এই অসুস্থতা দেখা দেয়।
খাদ্যে বিষক্রিয়া খুব বিরল কোনো রোগ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন—অর্থাৎ প্রতি সাতজনের একজন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
কীভাবে ঘটে খাদ্যে বিষক্রিয়া?
খাবার বিষাক্ত হয়ে ওঠার পেছনে সাধারণত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে: ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ভাইরাস। এ জীবাণুগুলো প্রায় সব ধরনের খাবারেই থাকতে পারে। রান্নার সময় তাপ সাধারণত এগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ খাবার, কিংবা দীর্ঘ সময় ফ্রিজের বাইরে রাখা রান্না করা খাবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
কখনো কখনো অসুস্থ কেউ হাত না ধুয়ে খাবার তৈরি করলে মল বা বমির জীবাণু খাবারে ছড়িয়ে পড়ে। যেখান থেকে শুরু হয় সংক্রমণ।
লক্ষণ যেভাবে ধরা দেয়
খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট থেকে কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক সপ্তাহ পরও খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- পেটে মোচড় ও ব্যথা
- ডায়রিয়া
- বমি ও বমি বমি ভাব
- ক্ষুধামন্দা
- হালকা জ্বর
- দুর্বলতা ও মাথাব্যথা
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই লক্ষণগুলো কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে খাদ্যে বিষক্রিয়া প্রাণঘাতী হতে পারে—
- তিন দিনের বেশি সময় ধরে ডায়রিয়া
- ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর
- কথা বলতে বা দেখতে অসুবিধা
- মারাত্মক পানিশূন্যতা
- প্রস্রাবে রক্ত
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণ
খাদ্যে বিষক্রিয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ব্যাকটেরিয়া। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—সালমোনেলা, ই. কোলাই, লিস্টেরিয়া, ক্যাম্পিলোব্যাক্টার, শিগেলা ও ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম। সিডিসির হিসাব অনুযায়ী, শুধু সালমোনেলাই যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার খাদ্যে বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী।
ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি পরজীবী ও ভাইরাসও খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটায়। টক্সোপ্লাজমা গন্ডি, জিয়ার্ডিয়া, বিভিন্ন ধরনের ফিতাকৃমি ও নোরোভাইরাস এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। গর্ভবতী নারী ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরজীবী সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো প্রতিরোধ। এজন্য উচিৎ—
- খাবার ভালোভাবে রান্না করা
- রান্নার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা
- বাসি বা সন্দেহজনক খাবার না খাওয়া
- বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা
বিশেষ করে গরমকাল ও বর্ষায় রাস্তার খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।










