নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার ইচ্ছা মানুষের স্বভাবজাত। কেউ নিজের লাজুক স্বভাব বদলে আরো মিশুক হতে চায়। কেউ দ্রুত রেগে গিয়ে পরে অনুশোচনায় ভোগে, চায় নিজের আবেগ সামলাতে শিখতে। কেউ চায় দৈনন্দিন জীবনে কম উদ্বিগ্ন হতে আর কারো লক্ষ্য আরেকটু দায়িত্ববান হওয়া। আর তখনই প্রশ্ন জাগে—মানুষ কি জন্ম থেকেই নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়া নাকি চাইলে বদলানো যায় ব্যক্তিত্ব?

মনোবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ব্যক্তিত্ব মূলত স্থির। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই ব্যক্তিত্বের কাঠামো প্রায় স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরাও মনে করেন, ব্যক্তিত্বের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সারাজীবন ধরে খুব একটা বদলায় না।

তবে ব্যক্তিত্বের মূল কাঠামো স্থিতিশীল হলেও এর অনেক সূক্ষ্ম স্তর পরিবর্তনযোগ্য। কঠোর পরিশ্রম, সঠিক অভ্যাস ও মানসিকতার পরিবর্তনে ব্যক্তিত্বেও বাস্তব পরিবর্তন আনা যায়।

960x0

প্রকৃতি নাকি পরিবেশ কী দিয়ে গড়ে ওঠে ব্যক্তিত্ব?

জিনগত বৈশিষ্ট্য আমাদের ব্যক্তিত্বের মৌলিক আকৃতি তৈরি করে। আবার পরিবেশ, বেড়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা, সমাজ সে আকৃতিকে নানা দিকে চালনা করে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, একই জিন থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ পরিবর্তিত হলে মানুষের স্বভাব-আচরণ বদলে যায়।

জন্মগতভাবে শান্ত স্বভাবের মানুষও দীর্ঘদিন চাপের পরিবেশে থেকে সহজেই বিরক্ত বা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আবার একই জিন পাওয়া যমজ ভাইয়েরা আলাদা পরিবেশে বড় হয়েও একইরকম ব্যক্তিত্ব নিয়ে বড় হতে পারে। ফলে জন্মগত বৈশিষ্ট্য যে গুরুত্বপূর্ণ তা অস্বীকার করা যায় না। তবে মনোবিজ্ঞানীদের মতে, জেনেটিক প্রভাব যত গুরুত্বপূর্ণই হোক ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে প্রকৃতি ও পরিবেশের অবিরাম মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

ব্যক্তিত্বের যে বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনযোগ্য

মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েক মনে করেন, ইন্ট্রোভার্ট, এম্বিভার্ট বা এক্সট্রোভার্ট কিংবা নম্রতা বা দৃঢ়তার মতো বৈশিষ্ট্যগুলো স্থির। কিন্তু ছোট ছোট অভ্যাস, বিশ্বাস, লক্ষ্য, প্রতিক্রিয়ার মতো আচরণ নির্ধারণকারী বৈশিষ্ট্যগুলো বদলানো যায়। বিশ্বাস বদলে গেলে আচরণ বদলায়, আর আচরণগত পরিবর্তনে ব্যক্তি-চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়।

উদাহরণ হিসেবে ডুয়েক দেখিয়েছেন—বুদ্ধিমান বলে প্রশংসা করলে শিশু মনে করে বুদ্ধিমত্তা স্থির। কিন্তু পরিশ্রমী বলে প্রশংসা করলে সে বিশ্বাস করে পরিশ্রমের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তা বাড়ানো যায়। এ বিশ্বাসই ভবিষ্যতে শেখার আগ্রহ, অধ্যাবসায় ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতায় পরিবর্তন আনে।

কীভাবে বদলানো যায় ব্যক্তিত্ব?

মনোবিজ্ঞান বলছে—প্রথমে বদলাতে হবে নিজের চিন্তা, মনোভাব, আর অভ্যাস। নিয়মিত অনুশীলনে আচরণ বদলানোর মাধ্যমে ব্যক্তিত্বে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা সম্ভব। নিজের সম্পর্কে থাকা স্থির বিশ্বাস ভাঙ্গতে হবে। যখন বিশ্বাস করতে শুরু করবেন আপনার স্বভাবের বদল সম্ভব তখনই পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে। নিজের চেষ্টাকে মূল্য দিন। গবেষণা বলছে, পরিশ্রমভিত্তিক মনোভাব মানুষকে বেশি শেখায়, বেশি বদলায়।

মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার পিটারসন ছিলেন স্বভাবগত ইন্ট্রোভার্ট। কিন্তু শিক্ষকতা ও একাডেমিক ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে তিনি এক্সট্রোভার্টের মতো অভিনয় শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে তা অভ্যাসে পরিণত হয়।

ব্যক্তিত্ব বদলানো সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। মানুষ যদি নিজের বিশ্বাসে পরিবর্তন আনে, নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে, আর শেখার আগ্রহ ধরে রাখে তবে ব্যক্তিত্ব বদলানো সম্ভব।

ওয়েলমাইন্ড অবলম্বনে