মানুষের পা আসলে অণুজীবের এক বিশাল আবাসস্থল। গবেষণা বলছে, পায়ের ত্বকে প্রায় এক হাজার ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক বাস করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানবদেহের অন্য যেকোনো অংশের তুলনায় পায়ে ছত্রাকের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি।
এর প্রধান কারণ পায়ের গঠন। পায়ের ত্বকে রয়েছে শরীরের সবচেয়ে বেশি ঘামগ্রন্থির কিছু অংশ। সারাদিন হাঁটা, দাঁড়িয়ে থাকা বা জুতা পরার ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘাম তৈরি হয়। পায়ের আঙুলের ফাঁকের জায়গাগুলো উষ্ণ, আর্দ্র ও আলোবিহীন হওয়ায় ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জন্য তা আদর্শ পরিবেশ। সেখানে তারা ঘাম ও মৃত চামড়ার কোষকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করে বেঁচে থাকে। এ অণুজীবগুলোর তৈরি করা বর্জ্যই মূলত পা, মোজা ও জুতোর দুর্গন্ধের জন্য দায়ী।
দুর্গন্ধের পেছনে আসলে জটিল এক রসায়ন কাজ করে। ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ভিন্ন ধরনের গন্ধ তৈরি করে। কোনো ব্যাকটেরিয়া ঘাম থেকে এমন এক ধরনের অ্যালকোহল তৈরি করে যার গন্ধ পচা পেঁয়াজের মতো। আবার অন্য কিছু ব্যাকটেরিয়া এমন যৌগ তৈরি করে যার গন্ধ অনেকটা চিজের মতো। আর একদল ব্যাকটেরিয়া এমন এক অ্যাসিড তৈরি করে, যার গন্ধ ছাগলের গন্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ঘাম যত বেশি হয়, ব্যাকটেরিয়ার খাবার তত বাড়ে—আর সেই সঙ্গে বাড়ে দুর্গন্ধের তীব্রতাও।
এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে মোজা। মোজা ঘাম আটকে রেখে পায়ের চারপাশে আরো উর্বর এক পরিবেশ তৈরি করে। এতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক আরও সহজে বংশবিস্তার করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, জীবাণুগুলো কাপড়ের ওপর দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, তুলার কাপড়ে ব্যাকটেরিয়া প্রায় ৯০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম। ফলে ধোয়া ছাড়াই একই মোজা আবার পরলে পুরোনো জীবাণুর সঙ্গে নতুন জীবাণুর বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হয়।
মোজার ভেতরের জীবাণুগুলো শুধু পা থেকেই আসে না। সারাদিন হাঁটার সময় মোজা ঘরের মেঝে, জিমের ফ্লোর কিংবা বাইরের মাটি থেকে নানা অণুজীব তুলে নেয়। এ কারণেই এক গবেষণায় দেখা গেছে, একবার পরা পোশাকগুলোর মধ্যে মোজায় ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। একই টিশার্ট দ্বিতীবার পরলে সেখানে ৮০ হাজারের মতো ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। আর একজোড়া মোজা দ্বিতীয়বার পরায় তা হয়ে ওঠে ৮০-৯০ লাখ ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল।
এ জীবাণুগুলোর মধ্যে সবই নিরীহ নয়। মোজায় এমন ছত্রাকও পাওয়া গেছে, যেগুলো শ্বাসতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণের কারণ হতে পারে। এসব জীবাণু বিছানা, সোফা কিংবা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে অ্যাথলিটস ফুট নামের ছোঁয়াচে রোগের জন্ম দেয়।
জুতাও কিন্তু পুরোপুরি নিরাপদ নয়। মোজার জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে জুতোর ভেতরেও বসবাস শুরু করে। একই জুতা টানা কয়েকদিন পরলে ভেতরের ঘাম শুকানোর সুযোগ পায় না, ফলে দুর্গন্ধ ও জীবাণুর পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে।
আর এক্ষেত্রে এমন মোজা ও জুতা এড়িয়ে চলা দরকার, যেগুলো পা কে অতিরিক্ত ঘামায়। দিনে অন্তত একাধিকবার পা ধোয়া দুর্গন্ধ কমাতে সাহায্য করে, আর ফুট অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ঘাম কমিয়ে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিছু বিশেষ ধরনের মোজা আছে, যেগুলোতে সিলভার বা জিঙ্কের মতো উপাদান ব্যবহার করা হয়। এগুলো ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম।
মোজা পরিষ্কার করার ক্ষেত্রেও সঠিক পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে ধুলে বেশির ভাগ ময়লা উঠলেও সব জীবাণু নষ্ট হয় না। সেক্ষেত্রে রোদে শুকানো সবচেয়ে কার্যকর, কারণ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি প্রাকৃতিকভাবেই জীবাণুনাশক।










