সপ্তাহ শেষ হলেই অনেকের প্রথম কাজ অ্যালার্ম বন্ধ করে আরো খানিকটা সময় ঘুমিয়ে নেয়া। কর্মব্যস্ত সপ্তাহজুড়ে ঘাটতি পড়া ঘুম পুষিয়ে নেয়ার অতি পরিচিত কৌশল এটি। তবে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি উল্টো পথে ভাবছি? অর্থাৎ, সামনে ব্যস্ত বা ঘুমহীন সময় আসছে জেনে আগে থেকেই কি বাড়তি ঘুম ‘জমা’ রাখা যায়?

‘স্লিপ ব্যাংকিং’ বা ঘুম জমা রাখার ধারণা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্যগবেষকদের মধ্যে আলোচনা বেড়েছে। ধারণাটি হলো—কয়েক রাত ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমালে মস্তিষ্ক ও শরীর এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সঞ্চয় করতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ঘুমের ঘাটতি হলেও সতর্কতা, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে।

এরই মধ্যে টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ধারণা। দীর্ঘ ভ্রমণ, রাত জেগে কাজ বা বড় কোনো ইভেন্টের আগে অনেকেই ঘুম ‘ব্যাংক’ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—বিষয়টি কি সত্যিই কাজ করে?

গবেষণার শুরু সেনাবাহিনীতে

ঘুম ব্যাংকিংয়ের ধারণাটি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচনায় আসে ২০০৯ সালে। মিয়ামির একটি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, টানা তিন রাত প্রায় ৯০ মিনিট করে অতিরিক্ত ঘুম পরবর্তী সপ্তাহের নাইট শিফটে তাদের কর্মক্ষমতা উন্নত করেছে।

খেলাধুলার ক্ষেত্রেও মিলেছে ইতিবাচক ফল। নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ক্রীড়াবিদদের ঘুম ব্যাংকিং ভুলের হার ও প্রতিক্রিয়ার সময় কমাতে সাহায্য করে। পেশাদার রাগবি খেলোয়াড়রা তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে শারীরিক চাপ কমাতে পেরেছেন। টেনিস খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ নয় ঘণ্টা ঘুম সার্ভের নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের ঘুম বাড়ানোর ফলে শুটিংয়ের সাফল্য ও দৌড়ের গতি—দুটিই বেড়েছে।

ব্যাংক না ক্রেডিট কার্ড?

তবে ঘুম ব্যাংকিং নিয়ে সবাই একমত নন। সমালোচকদের মতে, গবেষণাগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না—ঘুম সত্যিই ‘সংরক্ষণ’ করা যাচ্ছে, নাকি আগের ঘুমের চাহিদাই পূরণ হচ্ছে। শিফট কর্মীদের নিয়ে করা এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় গবেষণার পদ্ধতিগত পক্ষপাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, কর্মক্ষমতা বাড়ার কারণ যে আগাম ঘুম এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

বিতর্কের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কেন ঘুমাই?

হ্যাকেনস্যাক মেরিডিয়ান স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক পিটার পোলস বলেন, ঘুম আমাদের বিপাক, হরমোন, স্নায়ু ও মানসিক কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে মস্তিষ্কের জন্য এটি তথ্য বাছাই ও সংরক্ষণের সময়।

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি অধ্যাপক মাইকেল হাওয়েল বলেন, দিনের বেলায় শরীর ও মস্তিষ্কে নানা বর্জ্য পদার্থ জমে। ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক সেগুলো পরিষ্কার করে। একই সঙ্গে শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় গ্লাইকোজেন পুনরায় মজুত হয়।

রুপ ও তার সহকর্মীদের ধারণা—এই বাড়তি পরিষ্কার ও শক্তি সঞ্চয়ই ঘুম ব্যাংকিংয়ের মূল কার্যপ্রক্রিয়া।

কতটা ঘুম দরকার?

হাওয়েলের মতে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমই আদর্শ। চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে স্বাভাবিক থাকা মানুষ খুবই বিরল।

ঘুমের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি হলে তার প্রভাব জমতে থাকে। কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে কর্মক্ষমতা কমে, উদ্যম হারায়, চিন্তাশক্তি ধীর হয়ে পড়ে। শেখার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। ভাষা, সংগীত বা খেলাধুলার নতুন কৌশল আয়ত্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কখন ও কীভাবে ঘুম ‘জমা’ করবেন?

হাওয়েলের পরামর্শ, সামনে ঘুমের ঘাটতির আশঙ্কা থাকলে এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে প্রতিরাতে ৩০-৬০ মিনিট অতিরিক্ত ঘুমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তার মতে, অনেকের জন্য সকালে দেরি করে ওঠা সহজ, যদিও সবার ক্ষেত্রে তা একরকম নয়। দিনের বেলা ছোট ঘুম বা ‘ন্যাপ’ও ভালো কাজে আসে—যদি তা রাতের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়।

তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—যারা ইতোমধ্যে ঘুমের ঋণে ডুবে আছেন, তারা কি ঘুম ব্যাংকিং থেকে লাভবান হবেন?

এ বিষয়ে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক এলিজাবেথ ক্লারম্যান ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে, মানুষ ক্লান্ত না হলে অতিরিক্ত ঘুমাতে পারে—এমন প্রমাণ নেই। তাই ঘুমকে তিনি ‘পিগি ব্যাংক’ নয়, বরং ‘ক্রেডিট কার্ড’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। অর্থাৎ ঋণ জমতে পারে, কিন্তু উদ্বৃত্ত নয়।