শীতকালে দুপুর পেরিয়ে বিকেল আসার আগেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। দিন ছোট হয়ে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মন খারাপের রোগ। মনোবিজ্ঞান বলে, দিনের আকার ছোট হওয়া, রোদ কমে যাওয়া, বাতাসে ঠান্ডা আর স্যাঁতস্যাঁতে ভাব মনে অদ্ভূত চাপ তৈরি করে। অনেকেই এটিকে সাধারণ শীতের বিষণ্নতা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা স্যাড বলে অভিহিত করা হয়।

এটি এক ধরনের ঋতুভিত্তিক বিষণ্নতা, যা সাধারণত শরৎ বা শীত মৌসুমে দেখা দেয়। আর বসন্তে ধীরে ধীরে সেরে যায়। দীর্ঘ সময় সূর্যালোকের অভাব, ঠান্ডা আবহাওয়া ও দৈনন্দিন জীবনের ছন্দপতন-এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে ও শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • অবিরাম ক্লান্তি ও আলস্যবোধ: ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট, সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব, শক্তির ঘাটতি।
  • মনমরা ভাব, হতাশা বা শূন্যতা অনুভব: মেজাজ ক্রমাগত খারাপ থাকা, কান্না পেতে থাকা, অনুপ্রেরণা কমে যাওয়া।
  • খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বা ক্ষুধা বৃদ্ধি: রুটি, পাস্তা, মিষ্টি জাতীয় কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ইচ্ছে বাড়ে।
  • ওজন বৃদ্ধি: অতিরিক্ত খাওয়া ও শরীরচর্চার কমতির কারণে ওজন বেড়ে যেতে পারে।
  • একাকীত্ব অনুভব ও সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলা।
  • কনসেন্ট্রেশন কমে যাওয়া, কাজের প্রতি অনীহা।

অনেক ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ এতটাই তীব্র হয় যে তা দৈনন্দিন কাজ, সম্পর্ক ও কাজের উৎপাদনশীলতায় বড় প্রভাব ফেলে।

21683793_Good-and-bad-mood-flat-vector-illustration-1320x800

কারণ:

এ ডিসঅর্ডারের কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা —

  • সূর্যালোকের অভাব: শীতে দিনের আলো কমে যায়। ফলে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা সার্কেডিয়ান ব্যাহত হয়। এতে ঘুম-জাগরণ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গোলমাল দেখা দেয়।
  • সেরোটোনিন হরমোনের ঘাটতি: মানবদেহে সেরোটোনিন হলো ‘হ্যাপিনেস হরমোন’। সূর্যালোক কম থাকলে এর উৎপাদনও কমে যায়।
  • মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: মেলাটোনিন শুধু ত্বকের রঙ নয় ঘুমও নিয়ন্ত্রণ করে। শীতে এটি বেশি উৎপন্ন হওয়ায় ঘুমঘুম ভাব ও ক্লান্তি দেখা দেয়।
  • ভিটামিন-ডি-এর অভাব: রোদ কম পাওয়ার ফলে শরীরে ভিটামিন-ডি কমে গিয়ে মেজাজ খারাপের প্রবণতা বেড়ে যায়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

  • যারা শীতের দেশ বা উত্তরাঞ্চলে বাস করেন
  • যাদের পরিবারে ডিপ্রেশন বা স্যাডের ইতিহাস আছে
  • পরিসংখ্যান বলছে নারীরা পুরুষদের তুলনায় ৩-৪ গুণ বেশি আক্রান্ত হন
  • কিশোর-তরুণ
  • যারা ইতোমধ্যে ডিপ্রেশন বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন

মোকাবিলায় কী করা যেতে পারে?

  • লাইট থেরাপি: বিশেষ লাইটবক্স ব্যবহার করে সকালে ২০-৩০ মিনিট উজ্জ্বল আলোতে থাকা স্যাড কমানোর সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি।
  • রোদে থাকা: প্রতিদিন কিছুক্ষণ সূর্যালোকে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস মেজাজকে চাঙ্গা করে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম: মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন বাড়ায়, যা স্বাভাবিকভাবেই মন ভালো রাখে।
  • সুষম খাবার: সবজি, ফল, মাছ, বাদাম—এগুলো শরীরের হরমোন ভারসাম্য রক্ষা করে।
  • ঘুমের রুটিন ঠিক রাখা: রাত না জেগে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও জেগে ওঠা।

যদি লক্ষণগুলো তীব্র আকার ধারণ করে বা দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ওষুধ বা থেরাপি দিতে পারেন।