ঘুমের মধ্যে কান্না করা এক রহস্যময় অনুভূতি। কখনো কান্নার আওয়াজে নিজেকেই ধরফর করে জেগে উঠতে হয়, কখনো হয়তো পাশের জনের ধাক্কায় ঘুম ভাঙে। চোখের কোলে জল নিয়ে বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই বলার থাকে না। এ অনুভূতি অনেকের জন্য ভীতিকর ও শূন্যতার। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হিপনোপম্পিক ক্রাইং’।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান এ রহস্যময় কান্নার পেছনে বেশ কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছে।

অবদমিত আবেগ ও মানসিক চাপ

সারাদিন আমরা অনেক কষ্ট বা মানসিক চাপ মনের ভেতরে চেপে রাখি। কাজের চাপে বা লোকলজ্জার ভয়ে যে কান্না আমরা হাসিমুখে আড়াল করি, অবচেতন মন তা ভুলতে পারে না। রাতে যখন আমাদের মস্তিষ্ক শিথিল হয়, তখন সেই চেপে রাখা আবেগগুলো কান্নার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। এটি এক ধরনের ‘ইমোশনাল রিলিজ’।

দুঃস্বপ্ন বা ‘নাইট টেরর’

ঘুমের মধ্যে কান্নার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দুঃস্বপ্ন। বিশেষ করে যারা নাইট টেরর-এ ভোগেন, তারা ঘুমের ঘোরে চিৎকার করেন বা কাঁদেন। সাধারণ দুঃস্বপ্নের কথা আমাদের মনে থাকে, কিন্তু নাইট টেররের ক্ষেত্রে মানুষ কেন কাঁদছিল তা মনে থাকে না। এটি সাধারণত ঘুমের গভীর পর্যায়ে ঘটে।

ট্রমা বা অতীতের ক্ষত

যদি কেউ অতীতে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা, প্রিয়জন হারানো বা মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যায়, তবে তার প্রভাব ঘুমের ওপর পড়ে। একে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বলা হয়। অতীতের সে ভয়ংকর স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে ফিরে আসে আর কান্নার জন্ম দেয়।

শারীরিক ক্লান্তি ও স্লিপ অ্যাপনিয়া

অনেকে মনে করেন কান্না মানেই কেবল মনের ব্যাপার। কিন্তু শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকলে বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট হলে (স্লিপ অ্যাপনিয়া) শরীরের ওপর প্রচুর চাপ পড়ে। এ শারীরিক অস্বস্তি থেকেও মানুষ ঘুমের ঘোরে কাঁদতে পারে বা ডুকরে উঠতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে কান্না

শিশুরা ঘুমের মধ্যে প্রায়ই কাঁদে। এটি তাদের বিকাশের একটি অংশ। তারা নতুন কিছু শিখলে বা দিনের বেলা খুব বেশি উত্তেজিত থাকলে রাতে ঘুমের ঘোরে সেটার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। আবার অনেক সময় পেটে ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেও শিশুরা ঘুমের মধ্যে কাঁদে।

প্রতিকারের উপায় কী?

যদি মাঝে মাঝে এমন হয়, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু এটি যদি নিয়মিত হতে থাকে, তবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি:

  • স্লিপ হাইজিন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। শোয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন বা ল্যাপটপ দূরে রাখুন।
  • ডায়েরি লেখা: ঘুমানোর আগে মনের না বলা কথাগুলো একটি ডায়েরিতে লিখে ফেলুন। এতে মনের বোঝা হালকা হয় এবং অবচেতন মনে চাপ কমে।
  • রিলাক্সেশন: ঘুমানোর আগে বুক ভরে শ্বাস নেয়া বা হালকা মেডিটেশন অনেক কার্যকর।
  • পেশাদার পরামর্শ: যদি কান্নার কারণে আপনার দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয় বা সারাদিন মন খারাপ থাকে, তবে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নিন।