ঢাকায় আবাসিক এলাকায় গ্যাস সরবরাহের সংকট দীর্ঘস্থায়ী। পাইপলাইনের গ্যাস যেন সোনার হরিণ, বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়লেও উচ্চমূল্যের কারণে তা সবার নাগালের বাইরে। এ প্রেক্ষাপটে রাজধানীর অনেক এলাকায় ফিরেছে লাকড়ির চুলা, শহুরে জীবনে এতদিন যা প্রায় বিলুপ্তই ছিল।

বিশেষ করে পুরোনো ঢাকা, কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের কিছু অংশে বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা খোলা জায়গায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্নার প্রবণতা বাড়ছে। নগর জ্বালানি ব্যবস্থার এ অনানুষ্ঠানিক রূপান্তর স্বল্পমেয়াদে কিছু পরিবারকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনস্বাস্থ্য, অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

12-09-24-4

কোথায় পাবেন চুলা ও জ্বালানি?

আগের মতো মাটি খুঁড়ে চুলা বানানোর ঝামেলা এখন আর নেই। চাহিদার কথা মাথায় রেখে বাজারে এসেছে বহনযোগ্য নানা সমাধান:

  • মাটির পোর্টেবল চুলা: স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের দোকানে এখন এক বা দুই মুখের পোর্টেবল মাটির চুলা পাওয়া যায়। এগুলো ওজনে হালকা ও সহজেই স্থানান্তরযোগ্য।
  • লোহার ম্যাজিক চুলা: হার্ডওয়্যারের দোকানে টিনের বা লোহার পাতের তৈরি ছোট চুলা মিলছে। এগুলো লাকড়ি ও কয়লা দুই জ্বালানির মাধ্যমেই জ্বলে।
  • উন্নত ‘বন্ধু চুলা’: বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তৈরি এই চুলাগুলো এনজিও বা বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে পাওয়া যায়। এর বিশেষ চিমনি ধোঁয়াকে ঘরের বাইরে বের করে দেয়।
481069812_1624298534895468_2898712034376021495_n

লাকড়ির ক্ষেত্রেও বাজার সক্রিয়। শহরের কাঠপট্টি বা আসবাবপত্রের দোকানের বাতিল কাঠই এখন প্রধান জ্বালানি। রাজধানীর শ্যামবাজার, পুস্তা ও সুত্রাপুরের কাঠের আড়তগুলোতে জ্বালানি কাঠ মেলে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের কাঠ বাজার ও কেরানীগঞ্জ-কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকেও নিয়মিত লাকড়ি ঢাকায় সরবরাহ হচ্ছে। নগরীর অনেক এলাকায় ভ্যানগাড়িতে করে শুকনো ডালপালা বা চেরা কাঠ বিক্রি শুরু হয়েছে। এছাড়া সুপারশপ বা ই-কমার্স সাইটে এখন প্যাকেটজাত কাঠকয়লাও সহজলভ্য।

উপকারিতা: সাশ্রয় আর স্বাদের মেলবন্ধন

লাকড়ির চুলার সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর নির্ভরযোগ্যতা। গ্যাস নেই বা বিদ্যুৎ নেই—এমন দুশ্চিন্তা এখানে নেই।

  • সিলিন্ডার গ্যাসের তুলনায় লাকড়ি বা জ্বালানি কাঠের খরচ প্রায় অর্ধেক।
  • লাকড়ির চুলার ধীর আঁচে রান্না করা খাবারের স্বাদ অনন্য। বিশেষ করে মাটির হাঁড়িতে ডাল বা মাংস রান্নার আদি স্বাদ গ্যাসের চুলায় পাওয়া অসম্ভব।

ঝুঁকি ও আধুনিক জীবনের বিড়ম্বনা

তবে শহরের ছোট ফ্ল্যাটে লাকড়ির চুলা ব্যবহারের ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর এলাকায় লাকড়ির চুলা ব্যবহারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ। লাকড়ি পোড়ানোর সময় নির্গত কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা দীর্ঘদিন শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। রান্নাঘরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় নারী ও শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে।

এ ছাড়া ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে খোলা আগুন ব্যবহার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বস্তি ও পুরোনো ভবন এলাকায় সামান্য অসতর্কতা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

ব্যবহারের সঠিক কৌশল ও সতর্কতা

গ্যাস সংকট মেটাতে লাকড়ির চুলা ব্যবহার করলে কিছু নিয়ম মানা জরুরি:

১. কখনোই বদ্ধ রান্নাঘরে লাকড়ি জ্বালাবেন না। বারান্দার জানালা পুরো খুলে দিন অথবা ছাদে রান্না করুন।

২. সবসময় কড়া রোদে শুকানো কাঠ ব্যবহার করুন। কাঁচা বা ভেজা কাঠে ধোঁয়া বেশি হয়।

৩. রান্নার সময় পাশে অন্তত এক বালতি পানি বা বালু প্রস্তুত রাখুন। রান্না শেষে ছাই ও কয়লা পুরোপুরি নিভিয়ে দিন।