আমরা যখন কারো সংস্পর্শে আসি, তখন সাধারণত তাদের চেহারা, কথা বলার ধরন বা পোশাকের দিকেই নজর দিই। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, মানুষের শরীরের ঘ্রাণে লুকিয়ে থাকে বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক তথ্যের ভাণ্ডার। যদিও আধুনিক সভ্যতায় আমরা পারফিউম বা প্রসাধনী দিয়ে সে আদিম সংকেতগুলোকে ঢেকে রাখতেই বেশি অভ্যস্ত।

শরীরের গন্ধ মানুষের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেয়। কলেরা আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে মিষ্টি গন্ধ বের হয়, আবার তীব্র ডায়াবেটিসে শরীরের ঘ্রাণ অনেকটা পচা আপেলের মতো হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির ঘ্রাণ মনোবিজ্ঞানী মেহমেত মাহমুত জানান, খাদ্যতালিকাও ঘ্রাণে প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি মাংস খান, তাদের গায়ের গন্ধ অন্যদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।

তবে শরীরের গন্ধ অনেকটাই নির্ধারিত হয় মানুষের জিনগত কাঠামোর মাধ্যমে। প্রত্যেক মানুষের জিনের বিন্যাস আলাদা। এ বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে শরীরের গন্ধ আলাদা হয়। যমজ সন্তানদের গায়ের গন্ধে এতটাই একরকম হয় যে, কেবল ঘ্রাণ শুঁকে তাদের আলাদা করা কঠিন। একইরকমভাবে মায়ের শরীরের ঘ্রাণের সঙ্গে সন্তানের শরীরের ঘ্রাণের মিল পাওয়া যায়। বাবার শরীরের ঘ্রাণ আবার সন্তানের শরীরের ঘ্রাণে এভাবে প্রভাব ফেলে না।

পোল্যান্ডের ভ্রোক্লাভ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ আগ্নিয়েস্কা সোরোকোস্কা জানান, ঘ্রাণের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্বের কিছু দিক যেমন—নিউরোটিকজম বা মানসিক অস্থিরতা শনাক্ত করা সম্ভব। আমরা যখন কোনো প্রসাধনী বা পারফিউম কিনি, সেটিও মূলত আমাদের জিনগত পছন্দের ওপর ভিত্তি করেই বেছে নিই।

মেহমেত মাহমুতের গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। সেটি হলো—বিবাহিত পুরুষদের তুলনায় অবিবাহিত বা ‘সিঙ্গেল’ পুরুষদের শরীরের গন্ধ সাধারণত বেশি তীব্র হয়। এর একটি কারণ— টেস্টোস্টেরন হরমোন। সাধারণত সম্পর্কে থাকা পুরুষ বা যারা বাবা হয়েছেন, তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে আসে। ফলে তাদের গায়ের গন্ধও বদলে যায়। অন্যদিকে, উচ্চ টেস্টোস্টেরন সমৃদ্ধ অবিবাহিত পুরুষদের গন্ধ অনেক বেশি প্রকট হয়। বিশেষত উঠতি বয়সী ছেলেদের দেহে টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে বিশেষ ধরনের গন্ধ পাওয়া যায়।

তবে গবেষকরা এটিও লক্ষ্য করেছেন যে, ঘ্রাণের ওপর ভিত্তি করে মানুষের জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার হার খুবই কম। ঘ্রাণ আমাদের পছন্দের ইঙ্গিত দিলেও আমরা শেষ পর্যন্ত সামাজিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই বেশি গুরুত্ব দিই। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কেন ঘ্রাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়কে অবহেলা করি? গবেষক সোরোকোস্কা মনে করেন, মানুষের দৃশ্যমান অঙ্গগুলো (যেমন চেহারা) আমাদের বেশি বিভ্রান্ত করে। ঘ্রাণ অনেক বেশি নিখুঁত তথ্য দিলেও আমাদের মস্তিষ্ক সহজ পথ হিসেবে চোখের দেখাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

বিবিসি অবলম্বনে