যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,

আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,

চুকিয়ে দেব বেচা কেনা

মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনাদেনা,

বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে

তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,

তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

 

আজ একজন যোদ্ধা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে। মনে পড়ে, বছর খানেক আগে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেমন আছেন ভাই? সেই চিরচেনা স্মিতহাস্যে উত্তর দিয়েছিলেন, এক্সটেনশনে আছি, বুঝতেই তো পারছেন প্রফেসর সাহেব। তিনি আমাকে প্রফেসর সাহেব বলেই সম্বোধন করতেন।

তিনি হচ্ছেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। প্রকৃত অর্থে স্যার আবেদ একজন যোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা; স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে, বিশেষত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, তার চলমান যুদ্ধের কথা সবার জানা। সমাজে অন্যের আবেগ ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হওয়া বা ‘এমপেথি’র প্রকট অভাব ও নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ তাকে অপরিসীম কষ্ট দেয়। সেই সূত্রে ‘এমপেথি’ ও নারীর পক্ষে তার যুদ্ধংদেহী অবস্থান কারো অজানা নয়।

যোদ্ধা ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে একটা শিক্ষিত, স্বচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মা সাইয়েদা সুফিয়া খাতুন ও বাবা সিদ্দিক হাসান। ছোটবেলা থেকে তুখোড় ও তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন আবেদ পাবনা জিলা স্কুল ও ঢাকা কলেজ থেকে যথাক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে মাত্র ১৮ বছর বয়সে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ গমন করেন। সম্ভবত প্রথাগত পথ ও পদ্ধতি সবসময় তাঁর পছন্দ নয় বলে ১৯৫৪ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অজানা-অচেনা নেভেল আর্কিটেকচারে ভর্তি হলেন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পড়াশোনা শেষে ষাটের দশকে বাংলাদেশ তথা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্ববিখ্যাত বহুজাতিক শেল অয়েল কোম্পানির চাকরিতে যোগ দেন। মোটা বেতন, পয়মন্ত জীবনযাপন ও ধোপদুরস্ত চালচলন—এ তিন কারণে অনেকের কাছে এ চাকরি ছিল সোনার হরিণ; কারো কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো।