২০১৫ সালের ক্রিসমাস বিরতির সময় জোহানা রোডস একটি উদ্বেগজনিত ই-মেইল পান রয়াল ব্রোম্পটন হাসপাতালের এক ডাক্তারের কাছ থেকে। ব্রোম্পটন হূদরোগ ও ফুসফুসের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম হাসপাতাল।
মেইলে সে ডাক্তার জানান, ভয়ংকর ছত্রাকজাতীয় রোগ রোগীদের ত্বককে আক্রান্ত করছে, যা কিনা আইসিইউর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকা বাড়তি প্রটোকল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে।
সে সময়টা স্মরণ করে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ রোডস বলেন, ডাক্তার আমাকে বিষয়টা একবার দেখতে বললেন। আমি ভাবলাম এটা কতটা খারাপ হতে পারে। রোডস এগিয়ে যান বিশ্বের অন্যতম সেরা কার্ডিওলজি হাসপাতালকে জীবাণু শনাক্তে সাহায্য করার জন্য এবং সেগুলোকে ধ্বংস করতে। সেই জীবাণুটি ছিল ক্যানডিডা অরিস, সে সময় যা স্বল্প পরিচিত ছিল। তিনি যা খুঁজে পেয়েছিলেন তা ছিল ভয়ংকর। তার ভাষ্যমতে, আপনি ক্যানডিডা অরিসকে দেখার আগ পর্যন্তই কেবল কভিড-১৯ কে বেশি খারাপ মনে হবে।
ক্যানডিডা অরিস হচ্ছে সুপারবাগ (এটি মূলত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া), এমন
জীবাণু যা কিনা তাকে মারার জন্য তৈরি ওষুধকে এড়িয়ে যেতে পারে। যেখানে প্রাথমিক চিহ্ন বলছে কভিড-১৯ মহামারী ছত্রাকের বিপজ্জনক সংক্রমণকে ছড়িয়ে দিতে পারে। সি. অরিস বিশেষত হাসপাতালের সেটিংসে বেশ গুরুতর, যা কিনা এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে আরো বিস্তৃত হচ্ছে।
এ সুপারবাগ বেড শিট, বিছানার রেলিং, দরজা ও মেডিকেল ডিভাইসে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকে, যার ফলে ত্বকে স্থান করে নেয়া সহজ হয় এবং এক ব্যক্তি থেকে অন ব্যক্তিতে এটি সহজেই ছড়াতে পারে। এছাড়া যেসব রোগীকে টিউব ব্যবহার করতে হয় যেমন ক্যাথেটার কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাস কিংবা খাদ্য গ্রহণের জন্য যাদের টিউবের প্রয়োজন হয় তারা সি. অরিস সংক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। এ আক্রমণাত্মক পদ্ধতি বেশ স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, কারণ শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা কভিড-১৯-এর সঙ্গে যুক্ত।
ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মায়কোটিক ডিজিজ শাখার প্রধান টম চিলার বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখানে এমন জায়গা রয়েছে যেখানে আমরা সি. অরিসের উত্থান দেখেছি। অ্যাকুয়েট কেয়ার হাসপাতাল এবং কিছু কভিড-১৯ ইউনিটেও আমরা এটা দেখেছি। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এটা একবার গেড়ে বসলে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার।
এটি ক্যানডিডা বর্গের ছত্রাক যা কিনা ত্বকে ক্ষতের কারণে সৃষ্ট টিউমারের জন্য দায়ী। যা জিহ্বা ও যৌনাঙ্গে অতিমাত্রায় বৃদ্ধি লাভ করে। অন্তত ৪০টি দেশে সি. অরিসের সংক্রমণ দেখা গেছে। যেখানে তারা ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়েছে। সে তুলনায় করোনাভাইরাস সংক্রমিতদের মাত্র ১ শতাংশকে হত্যা করে, কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে অধিকসংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করে।
দুশ্চিন্তার বিষয়টি হচ্ছে যদি সি. অরিস হাসপাতালগুলোয় কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তা কিন্তু সুপারবাগের বাড়ন্ত সংকটকে আরো ভয়ানক করে তুলবে। যা কিনা এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষকে সংক্রমিত করেছে। গত বছর সিডিসি সি. অরিসকে আমেরিকায় সবচেয়ে বড় ওষুধ প্রতিরোধী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর সরাসরি প্রভাব এখনই বুঝতে পারা কঠিন। তবে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সি. অরিসের ১ হাজার ২৭২টি সংক্রমণের কথা জানা গেছে। যা কিনা ২০১৮ সালের রেকর্ড করা সর্বমোট সংক্রমণের ৪০০ শতাংশ বেশি।
তবে প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরো বেশি। কারণ কভিড-১৯ মহামারীর কারণে হাসপাতালগুলোতে সি. অরিস রোগের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম অনেকটাই থেমে গেছে। পাশাপাশি এ জীবাণু মানুষের ত্বকে বাসা বাঁধতে পারে কোনো ধরনের উপসর্গ না দেখিয়েই। এ ধরনের সুপারবাগ কভিড-১৯-এর কালে হয়তো হাজারো অতিরিক্ত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
কীভাবে এর সমাধান হবে?
২০১১ সালে আনুরাধা চৌধুরী নয়াদিল্লিতে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। তখন তিনি দুটি হাসপাতাল থেকে পাঠানো রক্তের নমুনায় অপ্রত্যাশিত কিছু দেখতে পেয়েছিলেন। যেখানে রহস্যময় ছত্রাক সংক্রমণ আইসিইউ ও নবজাতকদের ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। তখন মেডিকেল মাইকোলজির এ প্রফেসরকে জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে জীবাণু শনাক্ত করার জন্য এবং চিকিৎসার জন্য সেরা ওষুধটি প্রস্তাব করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। ফলাফলগুলো তাকে হতবাক করে দিয়েছিল। ছত্রাকের এ নমুনা যা রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল তা ছিল ক্যানডিডা অরিস।
একজন রোগীর কানে (যাকে লাতিন ভাষায় অরিস বলা হয়) সুপারবাগ প্রথম শনাক্ত হয় আরো দুই বছর আগে। কিন্তু চৌধুরী নিজে এটি তার আগে দেখেননি। তবে সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল যে
এ ব্যাকটেরিয়া সব ধরনের নমুনা ফ্লুকোনাযোলে প্রতিরোধী ছিল, যা ছিল ছত্রাক ও ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণের ওষুধ। এরপর গবেষকরা জানতে পারলেন যে এটি ওষুধ প্রতিরোধী।
অনুরাধার ওপর এখন দিল্লিতে মারাত্মতভাবে কভিড ও ক্যানডিডমিয়া আক্রান্ত রোগীদের দায়িত্ব বর্তেছে। ছোট একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ জন রোগীর ১০ জনেরই ওষুধ প্রতিরোধী সি. অরিস হয়েছে। যা কিনা হাতপাতাল থেকে সংক্রমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব ধরনের নমুনায় অকার্যকর হওয়ার সুযোগ আছে ফ্লুকোনাযোলের। কিন্তু সি. অরিসে আক্রান্ত চারজন আইসোলেটের মধ্যে অ্যাম্ফোটেরিকান বি-এর প্রতিরোধও দেখা গেছে। যা কিনা দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ। এই দুই শ্রেণীর ওষুধের প্রতিরোধী হয়ে ওঠা উদ্বেগজনক। কারণ তৃতীয় বিকল্প ওষুধ অনেক দেশের জন্য পাওয়া বেশ কঠিন।
রোডস বলেন, এখন আমাদের দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে কভিড-১৯-এর সঙ্গে অন্যান্য ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। যেখানে মানুষ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং মারা যাচ্ছে। আমাদের ধারণা, সি. অরিসের ক্ষেত্রেও তেমনটা দেখা যাবে।
অনুরাধা ও রোডস দুজনই টেস্টিং ও কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন, যা কিনা কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ। যা কিনা সি. অরিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তারা নিয়মিতভাবে সুপারবাগ পরীক্ষার ওপরও জোরারোপ করেছেন। কেউ যদি সি. অরিস টেস্টে পজিটিভ আসেন, তবে মেডিকেল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আরো নির্ধারণ করতে হবে তিনটি বিশেষ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ সংক্রমণ হ্রাস করতে পারে কিনা।
এ কৌশল সাহায্য করতে পারে সুপারবাগের কারণে ঘটা মৃত্যুগুলোতে চিহ্নিত করতে, যেটি কিনা খুবই জটিল একটি কাজ। কারণ এ রোগে আক্রান্ত অনেক রোগী অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে হয়তো হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
অনুরাধা বলেন, যদি আমরা চিহ্নিত করতে না পারি, তবে আমরা জানব না একজন রোগী কভিড-১৯-এর কারণে মারা গেল নাকি অন্য কোনো সংক্রমণে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে সংক্ষেপে অনূদিত





