করোনার ছোবল অর্থনীতির উল্লম্ফনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে অবশ্যই। তবুও মানবজীবন আগে না অর্থনীতি রক্ষা—এ বিতর্ক একেবারে অবান্তর। উভয়ের গতিময় জীবনই কাম্য। বাংলাদেশ সরকার অর্থনীতির অনিষ্টকে ন্যূনতম পর্যায়ে রেখেই করোনা আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সরকারপ্রধানের বলিষ্ঠ, উদ্ভাবনী ও ক্লান্তিবিহীন নেতৃত্বে দিকনির্দেশনা কভিড-১৯-কে পরাস্ত করার বড় প্রেরণা। এর মধ্যেই তিনি অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এর পুনরুত্থানের জন্য নীতি কৌশল ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলো ঘোষণা করেছেন।
ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা
বলতে দ্বিধা নেই, করোনার এই সূচনা, বিস্তার ও প্রতিকার প্রতিবিধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের মান নিয়ে প্রায় সব মহলেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তুতি যথাপরিমাণ থাকলে শুরুতে স্যাম্পল শনাক্ত ও পরীক্ষা এত ধীরগতি হলো কেন? এখন করোনার মহাবিপদ সারা দেশে বিস্তৃত; কেবল পার্বত্য এলাকা এবং উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে এটি তেমন ছড়াতে পারেনি। নিত্যদিনের খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছে: জ্বর, কাশি ও হাঁচি তথা করোনার লক্ষণ নিয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে—তারা বিগতদের হিসাবে নেই। আবার আইইডিসিআর থেকেই বলা হচ্ছে, আক্রান্তজন যারা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছে, তাদের মধ্যে সুস্থজনের সঠিক হিসাব জানা নেই। এসব গোঁজামিল অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার প্রমাণ দিচ্ছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায়ও এক ধরনের সম্ভবত অনভিজ্ঞতাপ্রসূত দোদুল্যমানতা এবং লকডাউনের বদলে কারফিউ জারি করা হলে মানুষ ভয়ে বাড়ি অথবা এলাকা ছাড়া হতো না। ৪-৫ এপ্রিলের আরএমজি কাণ্ডে লক্ষ লোকের স্থানান্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিন-তিনটি গণজমায়েত, পোশাক শ্রমিকদের প্রমোশন এবং দলীয় অন্তঃকলহের ঘটনা ও বোধ হয় কারফিউর ভয়ের কারণে জন্ম নিত না। লকডাউনের যে পরিমাণ অসুবিধা হয়েছে, কারফিউতে তার চেয়ে বেশি হতো বলেও মনে হয় না। মানুষ বরং লকডাউন কী তা দেখতে পর্যন্ত ঘর থেকে বের হয়েছে। লকডাউনকে তো মানুষ চেনে না। জানে না।
এরপর কী!
করোনার মহাবিপদ সামলাতে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সিং একটি কার্যকর পন্থা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরই মাধ্যমে সম্প্রতি লুপ্ত হয়ে যাওয়া স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয়ের পুনর্জন্ম বিশাল সুখবর। সেই সূত্রের মাধ্যমে যুগপত্ভাবে প্রধানত টেস্টিং বাড়িয়ে (প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি) এবং সেবার মান বৃদ্ধি করে মৃত্যুর মিছিলে যতি টানা আর এরই মধ্যে শুরু করা অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের ক্রমবর্ধমান জোর বাড়ানোই এখন কাম্য। করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে সে সন্দেহে জনজীবনে যে জিল্লতির সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা পচ্ছে তা হতাশাব্যঞ্জক। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং তদধীন ব্যবস্থাপনায় শুধু রশি টেনে দিলেই যথেষ্ট নাও হতে পারে। পরিবর্তন বোধ হয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। কেনাকাটায় দুর্নীতি, খরচের হেরফের ও ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসায় নিয়োজিতদের প্রতি হূদয়হীন আচরণের অভিযোগ প্রণিধানযোগ্য বটে!
এখন সবার জন্য স্বস্তির হবে আক্রান্ত অঞ্চলকে আর বাড়তে না দেয়া, স্যাম্পল শনাক্ত ও টেস্টিং কাজে ক্ষিপ্রগতি আনা এবং চিকিৎসা সুবিধার মানসম্পন্ন বিস্তার করে করোনা কার্ভটিকে ফ্ল্যাট করা, যাতে অচিরেই এর নিম্নগতি শুরু হয়।
সরকারপ্রধান ইচ্ছা করলে একটি ছোট অথচ কার্যকর যুদ্ধকালীন উপমন্ত্রিসভা গঠন করে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা ছাড়াও নতুন প্রত্যয় ও আঙ্গিকে অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের দীপ্তযাত্রা চালাতে পারেন। বিকল্প হিসেবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শকমণ্ডলীও করতে পারেন। জনগণের আশা ও প্রার্থনা: কোভিড-১৯ নামীয় দুশমন নিশ্চিহ্ন হোক এবং আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মাথাচাড়া দিয়ে উঠুক।
অর্থনীতির হালচাল: কৃষি
চারদিকে আশঙ্কা ও ভবিষ্যদ্বাণী—সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী আসন্ন। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৪ ভাগে নেমে এলেও এতে ৪০ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮০ শতাংশ লোক ফার্ম ও অফ ফার্ম কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং পালিত। বলা হয়, ‘গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’
এবং ‘গ্রামীণ অর্থনীতির জোয়ার ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি কখনো সমৃদ্ধিশালী হয়নি।’
এমন পরিপ্রেক্ষিতে স্বস্তির কথা: জোরেশোরে কাটা হচ্ছে বোরো ধান, যার পরিমাণ হতে পারে ২ কোটি ৪ লাখ টন চাল। সুদূর লালমনিরহাট থেকে ধান কাটার শ্রমিক ভাইদের নেয়া হয়েছে সুনামগঞ্জের ভাটির বোরো ক্ষেতে। ছাত্র, শিক্ষক, প্রশাসক, উকিল, মোক্তার, শ্রমিক, রাজনীতিবিদসহ অন্যান্য এলাকার লক্ষাধিক শ্রমজীবী সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ইত্যাকার এলাকার ক্ষেত থেকে পাকা বোরো ধান (কেউ কেউ অবশ্য টিভি ফটোর সুযোগে কাঁচা ধান কেটে সর্বনাশও করছেন) কিষান-কিষানির ঘরে পৌঁছে দিলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো হাঁক দেবে। তবে আউশের প্রস্তুতির জন্য হাসিনা সরকার সার ভর্তুকি এবং বীজ ও চারার টাকা সহায়তা দিচ্ছেন; তার সফল বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং প্রশাসন যেন আন্তরিক প্রচেষ্টা দেন। পরীক্ষামূলকভাবে শস্য বীমা দ্বিতীয়বারে ঘোষিত হয়েছে, এবার যেন এর বাস্তবায়ন হয় পাইলট পর্যায়ে। তবে চাষী ভাই যে প্রিমিয়াম দেবেন, তা কমাতে হবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে।
আমরা আগেই সুপারিশ করেছি, যেন সশস্ত্র বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মধ্যস্বত্বভোগীদের বখরাংশ কমিয়ে ২১ লাখ টন চাল সংগ্রহকাজ সম্পন্ন করা হয়। এতে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা মজবুত করা হবে। সঠিক জানা নেই, তবে গুদামজাতে ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আলু ও সবজি হিমাগারে রাখতে জোর দেয়ার কাজও বাড়াতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও সবজি, ফল, ডিম ও দুধ সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। বড় বড় বিপণি গোষ্ঠী, আগোরা, মীনা বাজার, স্বপ্ন, ইউনিমার্ট, ল্যাভেন্ডার তাদের কেনাকাটা বাড়িয়েছে। সেনাবাহিনী ও তাদের ইউনিটগুলোর জন্য কিনছে। পুলিশ বাহিনীও এরই মধ্যে কেনা শুরু করে না থাকলে নেমে পড়বে নিশ্চয়ই। বিশেষ করে ঘি ও পনির বানানোর কাজের আওতা বিপুলভাবে সম্প্রসারণ করে তরল দুধ সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। কমিয়ে দেয়া আমদানি শুল্ক আবারো বাড়িয়ে দেশেই উন্নত মানের গুঁড়ো দুধ উৎপাদনে প্রণোদনা দেয়া এ মৌসুমেই শুরু করা যেতে পারে।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য,
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী
(পরবর্তী অংশ আগামীকাল)





