স্বাস্থ্য সুরক্ষার সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামোটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। অথচ সেই দেশটিই এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের মহামারীতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। যেখানে জুলাইয়ের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ৩.৫ মিলিয়ন এবং মারা গেছে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ। ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ছয় মাস পরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সংক্রমণের হার নিচের দিকে নামাতে পারেনি। এই সমস্যাযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে রয়েছে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কভিড-১৯ সামলানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ প্রতিক্রিয়া। তাদের দশটি প্রধান ত্রুটি রয়েছে, যার সবগুলো অন্যদের শেখায় কী করা যাবে না।

এক. সিদ্ধান্তগুলো বৈজ্ঞানিক উপায়ের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে নেয়া হয়েছিল। এই ব্যর্থতা শুরু হয়েছিল একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে। তিনি শুরুতে এটাকে মৌসুমি ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করে বাতিল করেছিলেন। তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে টাস্ক ফোর্সের প্রধান করেছিলেন কী করতে হবে তার পরামর্শ দেয়ার জন্য। যদিও তাকে কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

দুই. মহামারীকে চিহ্নিত করতে আইন দ্বারা সমর্থিত কোনো জাতীয় পরিকল্পনা ছিল না। ভাইস প্রেসিডেন্টের টাস্ক ফোর্স নির্দেশিকা তৈরি করেছিল স্টেট ও স্থানীয় পর্যায়ে ভাইরাসের টেস্টিং, ট্র্যাকিং ও চিকিৎসার জন্য। এছাড়া সেখানে ভাইরাস প্রতিরোধে আইসোলেশনে থাকা, মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল। যদিও কেবল নির্দেশিকা হিসেবেই ছিল, বাধ্যতামূলক কোনো আইন বা নীতি ছিল না।

তিন. মহামারীকে মোকাবেলা করা হয়েছে স্টেট ও স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে। এখানে মানসম্পন্ন কোনো ফেডারেল হস্তক্ষেপ ছিল না। গভর্নর ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের এটিকে সামলানোর ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়েছিল। ফলে পদ্ধতি ও ফলাফল রাজ্য ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে।

চার. জাতীয় পর্যায়ে টেস্টিং, মেডিকেল সরঞ্জাম ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমিত প্রবেশাধিকার ছিল। ফেডারেল সরকার এগুলোর একটি নামমাত্র উপস্থাপন করে। কিন্তু সরবরাহ ও সরবরাহ চেইনটি ছিল অপর্যাপ্ত। রাজ্যগুলোও বিদেশী ও বেসরকারি উৎস থেকে এগুলো পেতে নিজেদের মধ্যে লড়াই করেছে।

পাঁচ. মহামারী নিয়ে মিশ্র বার্তা এসেছে। টাস্ক ফোর্স নিয়মিত ব্রিফিং করেছে। ট্রাম্প এটাকে থামিয়ে দেন। তিনি এসব ব্রিফিংয়ের দায়িত্ব নেন এবং লোক দেখানো কাজ হিসেবে সামনে আসেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেন, মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন এবং অপ্রমাণিত ওষুধগুলোর প্রচারও করেন।

ছয়. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবকিছু দ্রুত খোলার জন্য চাপ দিয়েছেন। তিনি সবসময় আইসোলেশনে যাওয়ার বিরোধিতাও করেছেন। মানুষ ঘরে অবস্থান করতে শুরু করার পর পরই তিনি সবকিছু খুলে দেয়ার পরামর্শ দেন। এসব নিয়ে তিনি বিভ্রান্তিমূলক টুইটও করেছেন। জনস্বাস্থ্যের চেয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত নির্বাচনী স্বার্থকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

সাত. রোগের প্রকৃতিকে এগিয়ে যাওয়া। মহামারীর প্রাথমিক হটস্পট ছিল উত্তর-পূর্ব, মধ্য-পশ্চিম এবং ক্যালিফোর্নিয়ার নগর ও শহরগুলো। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের শুরু পর্যন্ত বিস্তার এসব স্থানে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং দেশজুড়ে শীর্ষে পৌঁছেছে বলে মনে হয়েছিল। ফলে জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস ও অ্যারিজোনা এগিয়ে যায় দ্রুত সবকিছু খোলার দিকে। ফলে তারা নতুন হটস্পটে পরিণত হয়।

আট. প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন কোনো পদ্ধতি ছিল না। যেখানে ঘরে থাকা, মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিধি প্রয়োগে স্টেটগুলোর মাঝে ভিন্নতা ছিল। কিছু স্টেট যেমন জর্জিয়া ও টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর এবং বড় শহরের ডেমোক্রেটিক মেয়ররা আলাদাভাবে এগিয়েছেন। গভর্নররা যেখানে কেবল নির্দেশনা দিয়েছেন, সেখানে মেয়ররা এসব চেয়েছেন আইন হিসেবে।

নয়. স্বাস্থ্যের উদ্বেগের তুলনায় অর্থনৈতিক উদ্বেগকে ভুলভাবে অগ্রাধিকার দেয়া। পুনরায় সবকিছু খোলার বিষয়টি করা হয়েছে কেবল অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করার জন্য, যা কিনা মহামারীর কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল্যও অনেক।

দশ. সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হচ্ছে নিয়মিতভাবে বিশেষজ্ঞ মত খারিজ করা এবং পাত্তা না দেয়া। শুরু থেকেই ট্রাম্প আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং টাস্ক ফোর্স মেম্বার অ্যান্থনি ফাউসির মতকে বাতিল করে এসেছেন এবং বাস্তবতার নিজস্ব ধারণার প্রচার করেছেন।

সব মিলিয়ে কয়েকটি বিকল্প বাদ দিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমেরিকা ভাইরাস মোকাবেলায় সক্রিয়তার চেয়ে প্রতিক্রিয়াশীলতা বেশি দিয়েছে। এই ব্যর্থতার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী হচ্ছেন ট্রাম্প। যিনি কয়েক মাস আগেও মাস্ক পরার বিরোধিতা করে সম্প্রতি মাস্ক পরেছেন এবং যিনি নিয়মিত বলে আসছেন ভাইরাস হুট করে উধাও হয়ে যাবে। করোনা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই উপরোল্লিখিত শিক্ষা অন্যান্য দেশ নিতে পারে।

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে সংক্ষেপে অনূদিত