নভেল করোনাভাইরাস মহামারী প্রতিরোধে পুরো বিশ্ব কার্যকর ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় থাকলেও লাতিন আমেরিকার কিছু মানুষ অপ্রমাণিত চিকিৎসার দিকে ঝুঁকেছে। আইভারমেকটিন নামের একটি ওষুধ করোনাভাইরাসের চিকিৎসা হিসেবে নিরাপদ বা কার্যকর কিনা এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় গবেষকরা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বাইরে এর ব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছেন। কিন্তু ওই অঞ্চলটির বিপুল পরিমাণ মানুষ এটা গ্রহণ করায় গবেষকদের পক্ষে ওষুধটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

সস্তা ও কাউন্ডার ওষুধ আইভারমেকটিন বহু দশক ধরে গবাদি পশু এবং পরজীবী কৃমিতে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়ে আসছে। বিগত কয়েক মাসে পেরু, বলিভিয়া, গুয়েতেমালা ও লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতে কভিড-১৯-এর প্রতিরোধক হিসেবে ওষুধটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

মে মাসে ওষুধটির এতটাই চাহিদা ছিল যে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা উত্তর বলিভিয়ার বাসিন্দাদের জন্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ডোজ সরবরাহ করেছিলেন। একই মাসে মানব-করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা হিসেবে কালোবাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ২০ হাজার বোতল অ্যানিমেল-গ্রেড আইভারমেকটিন জব্দ করেছিল পেরুর পুলিশ। জুলাইয়ের পেরুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছিল, দেশে ওষুধটির সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করতে তারা ৩০ হাজার ডোজ প্রস্তুত করবে।

তবে আইভারমেকটিন কভিড-১৯ থেকে মানুষকে রক্ষা করে—এমন প্রমাণ খুব কম। কিছু প্রাথমিক গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ওষুধটির অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তখন থেকেই লাতিন আমেরিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে অংশগ্রহণকারী পেতে লড়াই করতে হচ্ছে, কারণ এরই মধ্যে অনেকেই এ ওষুধটি গ্রহণ করেছেন।

বিশ্বজুড়ে ওষুধটির ৪০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা পেরুর রাজধানী লিমার কেয়েতানো হেরেদিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বাস্থ্য গবেষক প্যাট্রিসিয়া গারসিয়া বলেন, ট্রায়ালে অংশ নিতে আসা ১০ জনের মধ্যে আটজনই আইভারমেকটিন গ্রহণ করেছেন এবং তাদের তো আমি এ ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করাতে পারি না।

অপ্রমাণিত এ ওষুধটি গ্রহণের এমন প্রবণতা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বাধার সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন কেয়েতানো হেরেদিয়ার মহামারী বিশেষজ্ঞ সিজার উগারতে গিল। তিনি বলেন, ওষুধটির জনপ্রিয়তার কারণে এটা না খাওয়া স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। আবার চিকিৎসকরা ওষুধটি দেয়ার সময়ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি উল্লেখ করছেন না। এর অর্থ হলো সুরক্ষার মূল্যবান ডাটা হারিয়ে যাচ্ছে।

যদিও বেশির ভাগ মানুষ আইভারমেকটিনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না দেখালেও এটা কাঁপুনি, খিঁচুনি, অলসতা ও বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যুক্ত। ২০১৮ সালের একটি বিশ্লেষণে জেনেটিক মিউটেশনযুক্ত লোকদের মধ্যে মস্তিষ্কের ক্ষয়ক্ষতি ও কোমা হওয়ার ঘটনা পাওয়া গেছে। এটা আইভারমেকটিনকে রক্ত প্রবাহ থেকে মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করতে দেয়।

তবে নানা ধরনের বাধার পরও গবেষকরা ওষুধটির পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে আর্জেন্টিনার ওরানের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সাল্টার সংক্রমক রোগের চিকিৎসক আলেজান্দ্রো ক্রোলোভিয়স্কি ও তার সহকর্মীরা কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে আইভারমেকটিনের কার্যকারিতা নিয়ে একটি ছোট ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল প্রকাশ করেছিলেন। গবেষকরা ৪৫ জন হালকা ও মাঝারি অসুস্থ কভিড রোগীদের মধ্যে ৩০ জনকে আইভারমেকটিন ও বাকিদের কেবল আদর্শ যত্নে রাখা হয়েছিল। তাদের গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, আইভারমেকটিনের উচ্চতর ডোজ পাওয়া রোগীদের দ্রুত ও আরো ভালোভাবে ভাইরাল নির্মূল হয়েছে। ফলাফলটি আশাব্যঞ্জক হলেও মানুষকে এটা গ্রহণের পরামর্শ দেয়ার মতো যথেষ্ট নয়। ফলাফলটি এখনো পিয়ার-রিভিউ হয়নি এবং কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

নেচার জার্নাল