অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকে? আমরা চেয়েছিলাম বালির নীচে মাথা গুঁজে দিয়ে ঝড় থামাবো। কিন্তু পেরেছি কি? না পারিনি। করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ যখন এশিয়া থেকে ইউরোপ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে, হাজার হাজার মানুষের ফুসফুস গিলে খেয়েছে তখন আমরা মত্ত ছিলাম ‘করোনা আছে, কি নেই’ এই সংশয়বাদী তত্ত্ব নির্মাণে। আমাদের তাপমাত্রা তত্ত্ব, ধর্মীয়তত্ত্ব, রাজনৈতিক তত্ত্ব সবই মিথ্যা করে দিয়ে কোভিড-১৯ ইতোমধ্যে তার উপস্থিতি জানিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক আগেই কোভিড-১৯ কে মহামারী ঘোঘণা করেছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠী, এবং শক্তিশালী অর্থনীতি নিয়েও পৃথবীর উন্নত দেশসমূহ সাধারণভাবে এই মহামারী মোকাবেলায় হিমহিম খাচ্ছে বিশেষভাবে নিউলিবারেল রাষ্ট্রগুলো কার্যত সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। যেমন: আমেরিকা, ইতালী, ফ্রান্স ও স্পেন। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মোতাবেক এখন পর্যন্ত ১৮৫ টি দেশের ১৮৪৮৫০৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত যেখানে মৃতের সংখ্যা ১১৪১৮৫। অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ সূচকীয় হারে বাড়ছে। সরকারী তথ্যমতে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৮০৩ জন যেখানে ৩৯ জন মৃত্যুবরণ করেছেন এবং ৪২ জন সুস্থ হয়েছে (আইইডিসিআর)। তবে বাংলাদেশে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যসেবাগত সীমাবদ্ধতার জন্য অনেকের ধারণা সংক্রমণের সংখ্যা উপর্যুক্ত সংখ্যার কয়েকগুণ হবে। যা মানুষের মধ্যে নতুন করে ভীতি ও আতংকের সৃষ্টি করছে।
করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সবথেকে আলোচিত স্ট্রাটেজি হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টাইন। এতে সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারী অফিস আদালত বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও ধর্মীয় উপাসনালয়, শিল্প কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়নি তবে তা বন্ধ রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে বা স্বল্প পরিসরে চালু রাখার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। অবাধ যাতায়াত ও জনসমাগম রোধ করা হচ্ছে। পরিবার থেকে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা লকডাউন করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। অর্থ্যাৎ রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক ও মানবাধিকার শিথিল করছে বাধ্য হয়েই—মানুষের প্রয়োজনে। এমন পরিস্থিতিতে সবকিছুকেই মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমনঃ পুঁজিবাদী সমাজে গার্মেন্টস বন্ধের ঘোষণা এবং সরকারীভাবে শিল্পমালিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য প্রণোদনার অঙ্গীকার। এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এই ধারাবাহিকতায় অনেকদেশে অপরাধীদের কারাগার থেকে মুক্তিও দেয়া হচ্ছে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে কারাগারে একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সেটা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে। যেমন ইরানে ১ লক্ষের বেশি শাস্তিপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন কারাবন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারও বিশেষ বিশেষ কারাবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ৩০০০ বন্দী মুক্তিদেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দিকে মানবীয় দৃষ্টি দিয়ে তাকালে এটি অবশ্যই সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাপকাঠিতে এই সিদ্ধান্তকে যাচাই করা জরুরী।
প্রথমত, রাষ্ট্র একটি জটিল প্রতিষ্ঠান। তার উদ্দেশ্য মূলত জনগনের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাকে জনগনের শিক্ষা, চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপত্তা প্রভৃতি নিয়ে ভাবতে হয়। তাই তার কাজের পরিধি ব্যাপক। কিন্তু এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ কার্যত থেমে গেছে করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের কারণে। কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যখাতকে আক্রমণ করলেও তার প্রভাবে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনসমূহও স্থবির হয়ে গেছে। ফলে জনগনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেমে গেছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, দিনমজুর, কৃষকদের অনেকেই অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। লকডাউনের কারণে সাধারণ মানুষের কর্মব্যস্ত জীবন অলসতা, একঘিয়েমিতে কাটছে। এছাড়াও সরকারি সিদ্ধান্ত ও ভাইরাস সংক্রমনের আতংকে সাধারণ মানুষ ঘর হতে বের হচ্ছে না। এমতাবস্থায় দরিদ্রতা, নিরাপত্তার অভাব, অবাধ সুযোগ প্রভৃতির কারণে চুরি ডাকাতিসহ সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। সংসারে অভাব, একঘেয়েমি জীবন, কর্মবিমুখ জীবনের কারনে সৃষ্ট মানসিক অশান্তি প্রভৃতি পারিবারিক নির্যাতনে জন্ম দিচ্ছে। অপরাধবিজ্ঞানের পাঠ থেকে জানা যায় এই রকম সংকটকালীন সময়ে নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন প্রভৃতি বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনা সৃষ্টি, লকডাউন নিশ্চিতকরণ, ও ত্রাণ সামগ্রী জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ পুলিশ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। একারণে তারা জনগণের শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ পাচ্ছে। ঢাকা ট্রিবিউনের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮১৩ জন লোকের বিপরীতে ১ জন পুলিশ বিদ্যমান যা আন্তর্জাতিক আদর্শ মানের থেকে অনেক কম। এমতাবস্থায়, করোনা পরিস্থিতির কারণে সমাজে যে অপরাধের বিস্তরণ ঘটছে সেটি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বা যোগ্যতা বাংলাদেশ পুলিশের থাকা সম্ভব কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষকরে উপযুক্ত অভিভাবকের অভাব ও সহজ টার্গেটের কারণে অনেকেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং পড়বে। এই সম্ভাব্য ও সুপ্ত অপরাধীরা সামাজিক শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করবে। এদের সাথে কারামুক্তির ফলে চিহ্নিত অপরাধীরা যুক্ত হলে, সেটি কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে তা ভেবে দেখা অবশ্য কর্তব্য।
তৃতীয়ত, কারামুক্তি কাদের দেয়া হবে? অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় রাজনৈতিক বন্দী, যারা সহিংস অপরাধে যুক্ত নয়, শাস্তির পরিমাণ এক বছরের কম বা যারা বিচারাধীন বন্দী, বা অপেশাদার অপরাধীদেরই কথাই বেশি বলা হচ্ছে। কোন অপরাধীকে মুক্তি দেয়ার আগে এই বিষয়ে অবগত হতে হবে যে সে সমাজে ফিরে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা? অর্থ্যাৎ কারাগার, যাকে আজকাল ‘সংশোধনাগার’ বলা হয় সেখানে সে কতটুকু সংশোধিত হয়েছে। অন্যথায় সেই অপরাধীকে কারাগারে রাখা নিছক অর্থের শ্রাদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ক্ষেত্রে এটি প্রণিধানযোগ্য যে, প্রথমবাবের মত কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামি যে সহিংস অপরাধে যুক্ত ছিল না, সে কারামুক্তির পর সহিংস অপরাধে যুক্ত হবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়া কি দেয়া যায়? কারণ দেখা যায় কারাগারে গেলে একজন চোর ডাকাত হয়ে বের হয়। অর্থাৎ, কারাগার সংশোধনের চেয়ে অপরাধের শিক্ষাটাই বেশি দেয়। এক্ষেত্রে কারাব্যবস্থা থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটি অন্য আলোচনা। মূল আলোচনায় ফিরি, বিচারাধীন বন্দিদের মুক্তির কথা অনেক গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে কারণ কারা পরিসংখ্যান অনুযায়ী তারাই কারাগারের মূল অধিবাসী। তারা বাংলাদেশের কারাগারের জনসংখ্যার ৮০% এর বেশি। তাদের কতজন অপরাধী বা অতীত অভিজ্ঞতায় সংখ্যাটা কত সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় কারণ বিচারবহির্ভূতভাবে কারামুক্তি দিলে সেটি আইনী ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অধিকন্তু বিচারাধীন অভিযুক্তদের ব্যাপারে কিভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হবে যে এরা অপরাধী বা অপরাধী নয়? যদি ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় কাউকে মুক্তি দেয়া হয় তবে সমাজে তার প্রভাবটিও বিবেচনা করতে হবে।
চতুর্থত, কারাবন্দিদের মুক্তি, সেটি দূর্যোগগত কারণেই হোক অথবা রুটিনগত ব্যাপারই হোক—যে বিষয়টি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মুক্তিদানের পর তাদের ফলোআপ ও পূর্ণবাসন যাতে তারা সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে পারে। আসামীদের মুক্তির পরে এটিই সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশে পদ্ধতিগত, বৈজ্ঞানিক, ও দ্বায়িত্বশীল ফলোআপের ব্যবস্থা নাই বললেই চলে। ফলে মুক্তিপ্রাপ্ত আসামীরা কোথায় কি করছে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ওয়াকিবহাল থাকে না। অন্যদিকে, পূর্নবাসন আমাদের দেশে একটি মিথ। কারণ কারাগারের প্রত্যয়টা এখানে শুধুই শাস্তির ধারণামাত্র, তার সাথে পূনর্বাসনের ধারণা অপরাধবিজ্ঞানের বইয়ের একটি তত্ত্বীয় আলোচনার অংশমাত্র। কর্মদক্ষতার অভাব, বেকারত্ব, সামাজিক কলংক বা স্টিগমা, পারিবারিক দূরত্ব প্রভৃতি কারণে মুক্তিপ্রাপ্ত আসামীদের পূণর্বাসনের পথ রুদ্ধ হয়। ফলে তারা সামাজিক বিচ্যুতিসহ নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অপরাধবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, কারামুক্তির পর মুক্ত কারাবন্দীরা অধিকাংশই দীর্ঘ বেকারত্বের স্বীকার হয়, যাদের অনেকেই মাদকে আসক্ত হয়। এছাড়াও সামাজিক কলংক, তকমা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি তাদের পূনর্বাসনের পথকে বেশিরভাগ সময় রুদ্ধ করে।
সুতরাং কারাগারে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে বিশেষ কারাবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে সরকার যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা আপাত দৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও এর সফলতা নির্ভর করছে সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের ভূমিকার উপর। স্বাভাবিকভাবেই তারা সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান। অধিকন্তু করোনার সংক্রমণে যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে তারা যুক্ত হলে অবস্থা আরো ভয়াবহ অবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই তাদের মুক্তির পরে উপযুক্ত ফলোআপ কর্মসূচী, রক্ষণাবেক্ষণ, ও পূনর্বাসনের ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সুবিধা, ও সক্ষমতা আছে কি?
একরামুল কবির রানা
এমএস, অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





