কভিড-১৯-এ আমরা দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হতে পারি কিনা সে রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। আগস্টে জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি হংকংয়ে নভেল করোনাভাইরাস দ্বারা দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। যদিও উদ্ভূত এই কেস স্টাডিগুলোর পিয়ার-রিভিউ হওয়া বাকি আছে।
পুনঃসংক্রমণের বেশির ভাগই ছিল চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এবং কিছু ছিল যুক্তরাষ্ট্রে, এর কোনোটিই অবশ্য ল্যাবে যাচাইকৃত ছিল না, বিষয়টিকে ফলস নেগেটিভ বা পজিটিভ এ সম্ভাবনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। এখন নতুন করে এমন পুনঃসংক্রমণের আশঙ্কা ইউরোপ এবং ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে। যদি সার্স-কোভ-২ ভাইরাস যা কভিড-১৯ সমগোত্রীয় অন্যান্য করোনাভাইরাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ অনুসরণ করে, তবে পুনঃসংক্রমণ ব্যতিক্রমের চেয়ে দ্রুতই নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে। সাধারণ সর্দি-কাশির করোনাভাইরাস একই ব্যক্তিকে একাধিকবার সংক্রমিত করার কারণে একে আঞ্চলিক মারী হিসেবে অনেক জায়গায় নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮ সালেও গবেষকদের সমন্বয়ে নেদারল্যান্ডস এবং কেনিয়ায় একটি গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে।
এখন এসে আমরা জানতে পারছি, সার্স-কোভ-২-এর দ্বিতীয়বার সংক্রমিত করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কতটা বেশি এবং কতবার সংক্রমণের আশঙ্কা করতে পারি, দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হওয়া উপসর্গকে কি আরো মৃদু করে নাকি আরো তীব্র করে তোলে। পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এ পুনঃসংক্রমণ অর্থ কী হবে?
পুনঃসংক্রমণের প্রাথমিক প্রমাণগুলো ১৯৭০ ও ১৯৮০ দশকের শেষের দিকে সংগঠিত ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সুস্থ স্বেচ্ছাসেবী করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন, এরপর তার সর্দি-জ্বর দেখা গেছে এবং তারপর সেরে উঠেছেন। এক বছর পর সে ব্যক্তি যখন ফের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসেন, একই চক্রের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে। ১৯৯০ সালের এক গবেষণাতেও এমনটা দেখা গিয়েছিল। এখানে কিছু ক্ষেত্রে একই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আমরা বছরের পর বছর লড়াই করি।
কেনিয়ার গবেষণা জিন সিকোয়েন্সিং পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এটি সংঘটিত হয়েছে গ্রামীণ হাসপাতাল এবং কিলিফি কাউন্টিতে বসবাসরত পরিবারগুলোতে। এ গবেষণা ট্র্যাক করেছে কমিউনিটির মাঝে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে চালিত হওয়া একাধিক করোনাভাইরাস সংক্রমণকে। প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারও সংক্রমিত হয়েছেন। যেখানে আবার প্রায় ১০ শতাংশ তৃতীয়বার সংক্রমিত হয়েছেন এবং অন্তত একজন ছিলেন যিনি চতুর্থবার সংক্রমিত হয়েছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনঃসংক্রমণ দেখা গেছে প্রথম সংক্রমণের তিন মাস পর।
যখন কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়মিত হতে থাকবে, তখন বেশির ভাগ মানুষ এটিকে অনুভব করবে যেভাবে তারা অন্য যেকোনো সর্দি-জ্বরকে করে থাকে। আপনি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আপনার শরীর এটা ভুলে যাবে। সে সঙ্গে আপনাকে এমন দুর্বল অবস্থায় রেখে দেবে যে ভাইরাসটি আবার ফিরে আসতে পারে। কভিড-১৯-এর সঙ্গে মৌসুমি সর্দি-কাশির মূল পার্থক্য হলো, মৌসুমি সর্দি-জ্বর কদাচিৎই ভীতিকর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যেখানে কভিড-১৯ মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
কেন পুনঃসংক্রমণ করোনাভাইরাস গোত্রের ক্ষেত্রে প্রায়ই হয়ে থাকে, আমরা জানি না। কিন্তু যেটি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো, যে সুরক্ষা আমরা সংক্রমণের সময় বা প্রাথমিক অবস্থায় অর্জন করি, তা তুলনামূলকভাবে দ্রুত দুর্বল হয়ে আসে।
কৌশল হিসেবে হার্ড ইমিউনিটির ওপর নির্ভর করা বেপরোয়া ও অকার্যকর হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইমিউনিটি এমন কিছু নয় যে যা শরীরকে মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেবে। এটি অনেক প্রতিক্রিয়ার জটিল সিরিজ দ্বারা গঠিত এবং এর মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও বিভক্ত করা কঠিন।
অন্যদিকে ভ্যাকসিন একবার শরীরের ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হলে তা শরীরকে সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। বিপরীতে তারা ইমিউন সিস্টেমকে সজ্জিত করে পরিশীলিত অ্যালার্ম সিস্টেমের সঙ্গে। যখনই আক্রমণকারী ভাইরাস অ্যালার্ম বন্ধ করে দেবে, তখনই এটি দ্রুত এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়াকে জাগ্রত করবে। ইমিউন মেমোরি সেল প্রশিক্ষিত হয় ভ্যাকসিন দ্বারা, অ্যালার্মকে কার্যকর করার জন্য, যা শরীরকে অনুমতি দেবে কয়েক সপ্তাহের পরিবর্তে কয়েকদিনের মধ্যে ভাইরাসকে মুছে দিতে। অনুপ্রবেশকারী ভাইরাসের জীবনকালকে শর্ট-সার্কিটিং করার এ পদ্ধতিটি প্রচলিত ও সফল। এ প্রক্রিয়াতেই অনেক ভ্যাকসিন আমরা গ্রহণ করেছি, যেখানে হাম, মাম্পস ও পোলিও অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব ভ্যাকসিন প্রাকৃতিক ইমিউন প্রতিক্রিয়াকে নকল করে পুনঃসংক্রমণ থেকে দীর্ঘমেয়াদি আবার কখনো কখনো জীবনব্যাপী ইমিউনিটি দেয়ার জন্য।
তবে করোনাভাইরাসের প্রাকৃতিক ইমিউন প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি জটিল। যেখানে ভাইরাসের বেশ ভালোভাবেই আমাদের পুনঃসংক্রমিত করার ক্ষমতা রয়েছে, যুক্তিসংগতভাবে অনুমান করা যায় যে প্রাকৃতিক ইমিউনিটি দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
কভিড-১৯ ও বৃহত্ভাবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি নিয়ে যা কিছু জানা গেছে, তার ভিত্তিতে এখানে তিনটি প্রশ্ন আছে, যা ভ্যাকসিন আবিষ্কারকদের অবশ্যই ভাবতে হচ্ছে, অবশ্য যদি সুরক্ষিত, কার্যকর এবং রক্ষাকারী ভ্যাকসিন প্রস্তুত করা সম্ভব হয় তবে আর কি।
প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে কত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইমিউনিটি (প্রাকৃতিক কিংবা ভ্যাকসিনজনিত) টিকে থাকতে পারে? দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন: একটি শক্তিশালী ইমিউন প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ সংক্রমণের ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে কি? যদি পুনঃসংক্রমণ ঘটে, তবে শরীরের ভাইরাসের যে পরিমাণ তা হ্রাসের পরিবর্তে বাড়তে পারে কিনা। তৃতীয় এবং চূড়ান্ত প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ যার মাধ্যমে করোনাভাইরাস পুনরায় একই ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে, যে কিনা এরই মধ্যে একবার সংক্রমিত হয়েছে।
একটি সম্ভাবনা হচ্ছে এটা আমাদের মেমোরি কোষকে নিষ্ক্রিয় করে, যা অ্যালার্মের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে সমতুল্য। নির্দিষ্টভাবে মেমোরি বি সেলকে লক্ষ্য করা এবং হত্যা করা। এখন এটি করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও ঘটছে কিনা তা অজানা।
যদি সার্স-কোভ-২ পুনঃসংক্রমণের পর মেমোরি প্রতিক্রিয়া মুছে না দেয়, তবে ভ্যাকসিন বিকাশের পথ কম-বেশি সুস্পষ্ট। সময়ের সঙ্গে হয়তো ভ্যাকসিনের নতুন প্রজন্ম নিয়ে আসতে হবে অ্যান্টিজেনিক প্রবাহের কারণে, যেমনটা করা হয়েছে ফ্লুর ক্ষেত্রে। ফলে ইমিউনিটি দুর্বল বা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কারণে হয়তো পুনরায় ভ্যাকসিন দেয়া লাগতে পারে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





