লাল, সাদা ও নীল রঙের পোশাক পরে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়েছে প্ল্যাকার্ড হাতে। যেখানে লেখা, ‘আরো চার বছর’
এবং ‘আমেরিকাকে আবারো মহান করে তোল’। বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে তারা রাস্তায় এসেছে একটি বার্তা দিতে। মাস্ক ছাড়া কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিলিত হয়েছে তারা, যা কিনা করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ।
১৩ সেপ্টেম্বর হেন্ডারসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শোভাযাত্রাটি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যনীতির লঙ্ঘন করেছে। যেখানে ৫০ জনের বেশি মানুষ নিয়ে সমাবেশ করা নিষিদ্ধ ছিল এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিধিনিষেধও ছিল। ট্রাম্প এটি জানতেন। কিন্তু কেউ তাকে থামাতে পারেনি। মহামারীর শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট একই রকম আচরণ করে আসছিলেন এবং হোয়াইট হাউজে মৌলিক স্বাস্থ্য নির্দেশনাগুলো মেনে চলাকে প্রত্যাখ্যান করেন। যা এখন চলমান প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, ৫ অক্টোবর খোদ প্রেসিডেন্টকেই হাসপাতালে নিতে হয়েছে এবং তাকে নিরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
ট্রাম্প, তার স্টাফ ও সমর্থকদের কার্যকলাপ নিয়ে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। করোনাভাইরাসের বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে আট মাসের বেশি সময় ধরে মিথ্যা বলে আসছেন ট্রাম্প এবং একে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাগুলোও এড়িয়ে গেছেন। এমনকি একটি সাক্ষাত্কারে তিনি মহামারীর শুরুতে ভাইরাল হুমকির ব্যাপারে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। ট্রাম্প মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়াদি নিয়ে শুরু থেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। পাশাপাশি মানুষকে উৎসাহিত করেছেন লকডাউন নীতি ভঙ্গ করার জন্য। তার প্রশাসন ভাইরাস ও তার ক্ষতিকর দিক হ্রাস করা বিষয়ে বিজ্ঞানীদের করা গবেষণাকে দমন ও সেন্সর করেছে। তার নিয়োগকারীরা সিডিসি ও এফডিএর মতো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে ভুল তথ্য দেয়ার জন্য, অসুস্থতা নিয়ে দুর্বল উপদেশ দেয়া এবং কভিড-১৯-এর চিকিৎসা সম্ভাব্য ক্ষতিকর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজিস্ট জেফরি শামান বলেন, এটা অদক্ষতা নয়, বরং নাশকতার পর্যায়ে পড়ে। তিনি মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টা নিয়ে নাশকতা করেছেন।
মহামারীজনিত সমস্যা
করোনাভাইরাস মহামারী প্রমাণ ও বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করার ঘটনাকে মনোযোগের একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। একটি বিষয় এখন পরিষ্কার: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মহামারীর প্রথম দিকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাইরাস দেশের জন্য একটি হুমকি কিন্তু তিনি সে সময় মিথ্যা বলাকেই পছন্দ করে নেন।
ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডের সঙ্গে কথা বলার সময়, তখনো যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১২ জন লোক করোনায় আক্রান্ত ছিলেন, ট্রাম্প ভাইরাস সম্পর্কে বলেছিলেন, এটাই বেশির ভাগ ‘স্ট্রেনিউস ফ্লু’র চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি মারাত্মক। এটা বেশ মারণঘাতী বিষয়। এই কথাগুলো ট্রম্প বলেছিলেন রেকর্ডেড ইন্টারভিউতে। যেটি সামনে আসে সেপ্টেম্বরে।
কিন্তু জনসম্মুখে প্রেসিডেন্ট একেবারে ভিন্ন ধরনের একটি বার্তা নিয়ে আসেন। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প এক শোভাযাত্রায় তার সমর্থকদের উদ্বিগ্ন না হতে বলেন। এপ্রিলে এসে তিনি আবার বলেন, যখন তাপমাত্রা বাড়বে তখন ভাইরাস রহস্যময়ভাবে চলে যাবে। ২৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এক সপ্তাহ পর একটি টিভি ইন্টারভিউতে তিনি বলেন, এটা বেশ মৃদু। আরেকটি রেকর্ডেড সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, শুরু থেকেই তিনি ভাইরাসকে গুরুত্বহীন দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, আমি শুরু থেকে ভাইরাসকে হীন দেখানোর চেষ্টা করেছি, যাতে লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে না পড়ে।
এ কথাগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর ট্রাম্প নিজের প্রচেষ্টার পক্ষে বলার সাফাই গাইতে থাকেন। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তা সামান্যই যুক্তিপূর্ণ এবং তিনি ভাইরাসের ভূমিকাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের জীবনকে হুমকিতে ফেলেছেন।
এখন এসে বিজ্ঞানীরা জানেন যে ভাইরাল সংক্রমণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। ফেডারেল সরকার তার শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে ব্যাপক টেস্ট ও কন্টাক্ট ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ না করে ট্রাম্প প্রশাসন রোগটিকে শহরে ও রাজ্যে ছড়িয়ে যেতে দিয়েছে। যেখানে রাজনীতি ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে ভাইরাসকে ট্র্যাক করা কিংবা নাগরিকদের সঠিক তথ্য দেয়া ছিল রীতিমতো অসম্ভব। বরং স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্কুলগুলো মার্চের শুরুতে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন ট্রাম্প তাদের এ কাজের জন্য সমালোচনা করেছিলেন।
গত বছর কেবল সাধারণ ফ্লুতে মারা যায় ৩৭ হাজার আমেরিকান। অথচ ৯ মার্চ তিনি টুইট করে বলেন, কোনো কিছুই বন্ধ হবে না। জীবন ও অর্থনীতি অব্যাহত থাকবে। এক মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে মৃত্যু ২১ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন মহামারী পুরোপুরি বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে ফেলেছে। দৈনিক হত্যা করছে দুই হাজার করে মানুষ।
শামান ও তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিল এটা তদন্ত করে দেখতে যে আগে থেকে ব্যবস্থা নিলে কী ঘটতে পারত। তারা একটি মডেল তৈরি করলেন, যা পুনরুৎপাদন করতে পারত ফেব্রুয়ারি থেকে মের শুরু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট জুড়ে কাউন্টি থেকে কাউন্টিতে যা ঘটেছে সেগুলো। তখন রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল বন্ধ করে। কিন্তু যদি এসব উদ্যোগ এক সপ্তাহ আগে নেয়া যেত তবে কী ঘটতে পারত।
২১ মে প্রিপ্রিন্ট সাইটে পোস্ট করা গবেষণায় দেখা গেছে, ৩ মে পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার জীবন বাঁচানো যেত। তবে যদি একই বিধিনিষেধগুলো দুই সপ্তাহ আগে প্রয়োগ করা যেত, তবে মৃত্যুসংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেত।
শামান বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো কারণ নেই যে এটা ঘটতে পারে। যদি আমরা আমাদের ব্যবস্থাগুলো আগে থেকে নেয়া শুরু করতাম তবে আমরা আরো ভালো করতে পারতাম।
ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ না করে বার্তা নিয়ন্ত্রণ
অর্থনীতির ধস ও মৃত্যুর বাড়তে থাকা সংখ্যার সঙ্গে ট্রাম্প ক্রমাগত আঙুল তুলেছেন চীনের দিকে। প্রেসিডেন্ট সমর্থন দিয়ে গেছেন একটি ভিত্তিহীন তত্ত্বকে, যেখানে বলা হয়েছে ভাইরাসটি সম্ভবত উহানের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনকে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ করেন। এমনকি একপর্যায়ে তিনি সংস্থাটিতে অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণাও দেন। এ পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে বৈশ্বিক সংকটে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানানোর অক্ষমতা হিসেবে।
অনেক বিশেষজ্ঞের কাছে এটা ছিল প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আরেকটা পাল্টা রাজনৈতিক কৌশল, যিনি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বার্তা নিয়ন্ত্রণকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু দিন শেষে তিনি ব্যর্থই হয়েছেন, যে ব্যর্থতার রেশ টানতে হবে আরো অনেক দিন পর্যন্ত।
নেচার থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত





