কভিড-১৯-এর সংক্রমণের হার যখন নির্দিষ্ট সীমার ওপরে উঠে আসে তখন দুই লাখ জনসংখ্যার বিশেষ একটি অঞ্চলে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে শিথিল শাটডাউন দিয়ে কার্যকরভাবে লড়াই করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়ই উঠে এসেছে এমন তথ্য।

বিশ্বব্যাপী মহামারী চলাকালে বিভিন্ন সময় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশৃঙ্খলাময় রাজনৈতিক বিভাজন এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিগুলো নিয়ে, ভাইরাস দুনিয়ার বিপর্যস্ত অবস্থার জন্য এ বিষয়গুলো বারবার সামনে নিয়ে এসেছেন তারা। তাদের মতে, এর ফলে কভিড-১৯-এর বিস্তৃতি প্রশমনের যে চেষ্টা তা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের গণিতবিদদের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব (ক্যাওস থিয়োরি) প্রয়োগ করে দেখা গেছে, যেকোনো ধরনের গঠনমূলক বিভাজন প্রকৃতপক্ষে মহামারীকে আরো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

এ গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, গটিনগিন ইউনিভার্সিটি ও দ্য ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব ডায়নামিক অ্যান্ড সেলফ অর্গানাইজেশন দ্বারা। সেই দলটি করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করে, যা অন্তনির্হিত ও এলোমেলোভাবে সংক্রমণের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করার বিষয়টিকে প্রদর্শন করে। তারা সেখানে লক্ষ করেছেন, স্বল্পসংখ্যক জনসংখ্যার মধ্যে কখনো কখনো মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং অন্যান্য মানসম্পন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সংক্রমণ সংখ্যা শূন্যে নেমে আসতে পারে।

রোগের এ স্বতঃস্ফূর্ত বিলুপ্তি তাদের বিস্মিত করেছে: যদি ছোট শহর কিংবা কাউন্টিগুলো আইসোলেশনের জন্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বেশি কিছু করে, তবে কি রোগের পুনরায় উত্থানের আগ পর্যন্ত মাঝে মাঝে কভিড-১৯-এর বিলুপ্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য বিধিনিষেধ তুলে দেয়া এবং জীবনযাপনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট?

এ কঠোর গাণিতিক বিশ্লেষণ দেখায় যে সত্যি সত্যিই এ ধরনের বিভাজন ও জয়ের কৌশল অন্তত তাত্ত্বিকভাবে কার্যকারিতা দেখাতে সক্ষম। তারা সেই ফল প্রকাশ করেন ‘ক্যাওস’ নামের জার্নালে। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী গবেষণাটি প্রকাশিত হয় একটি প্রি-প্রিন্ট সার্ভারে, যার এখনো পিয়ার পর্যালোচনা করা হয়নি। দলটি জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইতালি, নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডার কাউন্টি লেভেলের ডাটা ব্যব্যহার করে একই ধরনের গবেষণা পরিচালনা করে। প্রতিটি স্থানের জন্য তারা দুটি দৃশ্যকে তুলনা করেছেন। প্রথম দৃশ্যটিতে নেতারা, রাজ্যজুড়ে বা দেশজুড়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যেমনটা পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো কেবলই কার্যকরভাবে ফিরিয়ে এনেছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে, যখনই সংক্রমণ প্রান্তসীমার ওপরে উঠে গেছে তখনই চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এ বিধিনিষেধ কাউন্টি থেকে কাউন্টিতে আলাদাভাবে আরোপ করা হয়েছে। এমনকি বড় শহরের প্রতিবেশীদের মধ্যেও তা আলাদা ছিল। ফলে জনসংখ্যাও কার্যকরভাবে দুই লাখের চেয়ে কমের মধ্যে আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

উদাহরণস্বরূপ, বিকল্প এ কৌশলের অধীনে বড় ধরনের একটি প্রাদুর্ভাব ম্যানহাটনের পশ্চিম দিকের একটি অঞ্চলকে বাধ্য করেছে অপ্রয়োজনীয় চলাফেরাগুলোতে কয়েক সপ্তাহের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করতে। কিন্তু দ্বীপটির অন্য প্রতিবেশী অঞ্চলে সংক্রমণ সংখ্যা কম থাকা পর্যন্ত স্কুল, অফিস ও রেস্টুরেন্টগুলো খোলা ছিল।

গবেষকরা দেখেছেন যে এমনকি যখন সম্প্রদায়গুলো মাঝারি আকারে মেলামেশার অনুমতি দেয়, তখনো স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের এ কৌশল কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে কাটানো দিনসংখ্যাকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এই মডেলটি বলছে, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের এ কৌশলের সুফল দৃশ্যমান হতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। পাশাপাশি তারা কিন্তু এও বলেছে যে বিভাজনের এ কৌশল দীর্ঘমেয়াদে অনেক প্রাণও বাঁচিয়ে দিতে পারে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান