সামুদ্রিক লেটুস কিংবা শরীরে জীবাণুনাশক ইনজেক্ট করা আপনাকে কভিড-১৯-এর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। আবার ১০ সেকেন্ড নিঃশ্বাস আটকে রাখাও সার্স-কোভ-২-এর কোনো পরীক্ষা নয়। এমনকি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও মহামারী মোকাবেলায় মস্কোর রাস্তায় ৫০০ সিংহ ছেড়ে দেননি লোকজনকে ঘরে রাখতে বাধ্য করার জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্ণনা অনুযায়ী বড় এক ‘ইনফোডেমিক’ এই মহামারীর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তথ্যের বাড়তি চাহিদা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবন মান এবং কেবল ডিসেম্বর মাসে সামনে আসা কিছু উত্তরহীন প্রশ্নের কারণে মিথ, মিথ্যা সংবাদ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সামনে এসেছে। যার কিছু স্রেফ হাস্যকর এবং নির্বিষ বলে বাতিল হয়ে যেতে পাারে। কিন্তু এমন কিছু আছে যা কিনা মানুষের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরাই মূলত কভিড-১৯ সম্পর্কে এসব ভুল তথ্য থেকে বাঁচার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু তাদের কি উচিত এমন সময়সাপেক্ষ কাজে যুক্ত হওয়া নাকি তাদের উচিত কেবল ইতিবাচক গবেষণাগুলো চালিয়ে যাওয়া? যারা তথ্যের লড়াইয়ে নিযুক্ত হয়েছেন তারা কোনো সেরা উপায়ে করোনাভাইরাসের অসত্য তথ্যের মুখোমুখি হতে পারেন? নাকি বিজ্ঞানীদের উচিত কেবল নিজেদের গবেষণায় মনোনিবেশ করা? মহামারীর সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করা কি জনগণের জন্য সেবামূলক কাজ, নাকি এখানে তাদের ক্যারিয়ারের জন্য দরকারি উপাদানও আছে?

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ডাটা সায়েন্টিস্ট জেভিন ওয়েস্ট বলেন, আমি মনে করি বিজ্ঞানীরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারলে তাদের উচিত সামনের সারিতে গিয়ে দাঁড়ানো। কভিড-১৯ সংক্রান্ত ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা নীতিনির্ধারকদের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের প্রভাব এড়াতে সাহায্য করতে পারেন। সে সঙ্গে মহামারীর ব্যাপারে মানুষের বোঝাপড়া এবং মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারেন।

কভিড-১৯ যেসব পরিবর্তন এনেছে তার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে খবরের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৩টি দেশে চালানো একটি গবেষণা বলছে খবর দেখার পরিমাণ আগের চেয়ে ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। ওয়েস্ট বলেন, আমরা আমাদের ওয়েব ব্রাউজগুলো সবসময় রিফ্রেশ করছি। খোঁজ করছি ভালো খবরের এবং কভিড-১৯ সংক্রান্ত খবরের সন্ধানও করছি। কারণ এটি আমাদের এবং আমাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জরুরি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েস্ট সহনির্মাতা হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন কলিং বুলশিট। এটি বিজ্ঞানের নামে করা ভুল দাবি এবং ভুয়া পরিসংখ্যানগত প্রমাণগুলো চিহ্নিত করার একটি কোর্স। এছাড়া তিনি ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউজ সেন্টারের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ডিরেক্টর হয়েছেন। এ সেন্টারের কাজ হচ্ছে গুজব এবং সংকটকালে ভুয়া তথ্য নিয়ে গবেষণা করা।

চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুয়া দাবিগুলোর ওপর মনোযোগ দেয়াই এক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্য, যেন ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। উদাহরণস্বরূপ তাইওয়ানের ফ্যাক্টচেক সেন্টারের গবেষকরা জানুয়ারির শেষ দিক থেকে নিজেদের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেন রোগের ভুয়া প্রতিকারগুলো উন্মোচন করার জন্য। উদহারণস্বরূপ যেসব ভুয়া প্রতিকারের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সেগুলোর মধ্যে আছে তিল বা অন্যান্য তেলজাতীয় উদ্ভিদের ঘ্রাণ নেয়া, গরম ভাপ নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা কিংবা ভাইরাস ফুসফুসে যাওয়ার আগেই লবণ জল নাকে দিয়ে গ্রহণ করলে ভাইরাসের মরে যাওয়া। ভাইরাসের প্রতিকারের এই দাবিগুলোর জনপ্রিয় হওয়ার জন্য জ্ঞানের স্বল্পতাকে দায়ী করেছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।

যেসব ব্যক্তি মিথের ওপর বিশ্বাস রেখেছে তারা একেবারেই ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। কেউ কেউ আবার সেখানে লাভের চিন্তাও করে। মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ বিভাগ অনেক কোম্পানি ও ব্যক্তিকে এজন্য সতর্কবার্তাও দিয়েছে। যেখানে ভুয়া খবরের ওয়েবসাইট ইনফোওয়ারসের মালিক অ্যালেক্স জোনসও আছেন। আছে টেলেভানগেলিস্টের মালিক জিম বাকারও। উভয়ের বিরুদ্ধেই প্রমাণ নেই এমন তরল পদার্থ কভিড-১৯-এর চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। যা কেবলই অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত ছিল।

আবার অনেক কভিড মিথ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহূত হয়েছে। যেমন উহানের ল্যাব থেকে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। অনেকেই সে খবর বিশ্বাসও করেছে। তবে মূলত বৈজ্ঞানিক বিষয়ে মিথগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের প্রভাব বেশি থাকে। তাই রাজনৈতিক ভুয়া দাবিগুলো মিথ্যা প্রমাণের দায় অন্যদের ওপর ছেড়ে দেয়া ভালো বলে মনে করেন কেউ কেউ। অবশ্য বিজ্ঞানীদের নিজের ক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত কিনা তা নিয়ে দুই ধরনের মতই পাওয়া যাচ্ছে।

নেচার ম্যাগাজিন