লুজিয়া নামের একটি বার জার্মান সরকারের নির্দেশে এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে গেল। অবশ্য কেবল এ বারটিই নয়, ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের সব রেস্টুরেন্ট, বার, জিম এবং থিয়েটার অন্তত এ মাসের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। মূলত কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঝড় সামলানোর উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হোটেলগুলোও এখন আর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে লুজিয়া বারটির ম্যানেজার ফ্লোরেন্ট কিছুটা আশাবাদী, কারণ জার্মানির সংক্রমণ সংখ্যা এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় নিচে রয়েছে। ফ্লোরেন্ট বলেন, আশা করি আমরা এক মাসের মধ্যে আবার খুলতে পারব।
কভিড-১৯-এর সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা ধসে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ইউরোপীয় দেশ একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে। দুই মাস আগে সংক্রমণের সংখ্যা যখন কমতে শুরু করে, তখন বেশির ভাগ দেশই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আরো সীমিত ও নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ দিয়ে দ্বিতীয় ঝড় প্রতিরোধ করা যাবে। এখন ইউরোপ সেই ঝড়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যা এসেছে সুনামির গতি নিয়ে। মাথাপিছু আক্রান্তের দিক থেকে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক হান্স ক্লুগে গত ২৯ অক্টোবর বলেন, ইউরোপ আরো একবার মহামারীর এপিসেন্টারে পরিণত হয়েছে।
বেশির ভাগ দেশই এখানে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া। তারা এখানে কেবল বাজে পরিস্থিতি এড়াতে চাইছে। কর্মকর্তাদের মাঝেও সেরা উপায়টি কী হতে পারে তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। আর কেউ জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে। দিন বাঁচানোর লক্ষ্যে ভ্যাকসিন স্বল্পতার কারণে দেশগুলো হয়তো সিরিজ লকডাউনের মুখে পড়তে পারে। ভাইরোলজিস্ট আলবার্ট ওস্টারহাউস বলেন, এটা অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে। ইউরোপের হাতে আর কোনো কৌশল নেই।
লকডাউনকে একটি কার্যকর অস্ত্র মনে হয়েছিল যখন চীন এটি প্রথম প্রয়োগ করে। আরো অনেক জায়গায় এটা উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী অনেক দেশ বসন্তে এ উপায়টি গ্রহণ করে, যদিও মাত্রাগতভাবে পার্থক্য ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপে মহামারীর প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত ছিল। কিন্তু এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এটি সংক্রমণের পুনরুত্থান এড়াতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞ মাইকেল মেয়ার-হারম্যান বলেন, গ্রীষ্মকে ব্যবহারিকভাবে শূন্যের দিকে ঠেলে দেয়ার পরিবর্তে ইউরোপ ছুটি কাটাতে বেশি ব্যস্ত ছিল। মনে হচ্ছিল মানুষের মন থেকে ভাইরাস নিয়ে ভয় কেটে গেছে। তারা ধারাবাহিকভাবে শারীরিক দূরত্ব, মাস্ক পরা এবং বড় জমায়েত এড়ানোর বিধি লঙ্ঘন করেছে।
এপিডেমিওলজিস্ট গ্যাব্রিয়েল লেং বলেন, সংক্রামক বীজ সম্প্রদায়ের ভেতর সবসময় সীমার ওপরে ছিল, যেখানেই আপানি শারীরিক দূরত্বের নীতি শিথিল করেছেন, সবকিছু আবার আগের মতো ফিরে এসেছে।
ফলে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে এবং ভাইরাসের নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য কৌশলও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কিছু দেশ কখনই টেস্টিং, আইসোলেশন, ট্রেসিং এবং কোয়ারেন্টিন বিধি ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারেনি।
এখন মানুষের জীবন আবারো বদ্ধ ঘরে আটকে গেছে, পাশাপাশি শীতল আবহাওয়ায় ভাইরাসও আরো শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মডেলার অ্যাডাম কুশারাস্কি বলেন, আমি মনে করি শীত পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলবে।
লকডাউনই সঠিক উত্তর কিনা সে বিষয়ে অনেকে একমত নন। তবে বেশির ভাগ বিজ্ঞানী বলছেন, ইউরোপ যদি স্বাস্থ্য খাতে ধস ঠেকাতে চায়, তবে লকডাউন অনিবার্য। যদিও বসন্তের মতো কঠোর হওয়ার দরকার নেই।
কুশারাস্কি বলেন, তারা একই সময়ে একসঙ্গে সবকিছু করেছিল। এখন তারা সেসব বিধিনিষেধ এড়িয়ে যেতে পারে, যা মানুষের জীবনযাপনকে সীমায়িত করে কিন্তু তাতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ হবে না। সব মিলিয়ে এখন যা দরকার তা হলো ঝড়কে আঘাত করা। যদিও কাজটা অনেক কঠিন।
সায়েন্স ম্যাগ





