এ বছরের মার্চের শেষ দিকে যখন ৩২ বছর বয়সী শিল্পী হান্নাহ ডেভিস অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তার উপসর্গ এতটাই মারাত্মক ছিল যে বিছানায় শুয়ে সিনেমা দেখাও অসম্ভব ছিল। এমনকি টেক্সট ম্যাসেজ পড়ার ক্ষেত্রেও তিনি সমস্যা বোধ করছিলেন এবং তারপর তিনি কোনো চলচ্চিত্রের প্লট অনুসরণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। 

যখন তার ফ্লু জাতীয় উপসর্গ যেমন ক্লান্তি ও কাশি সময়ের সঙ্গে উন্নতি লাভ করছিল, তখন তিনি তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন এবং অন্যান্য কগনিটিভ জটিলতাও বোধ করতে থাকেন। এ সময় তার দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে, হূত্কম্পন বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হতে থাকে, নিদ্রাহীনতা এবং নানা ধরনের ব্যথাও হতে থাকে। তিনি বলেন, এটা শুনতে বেশ উদ্ভট মনে হবে। আমি তিন মাস অসুস্থ ছিলাম, যা হয়তো অনেক ডাক্তারের কাছে শুনতে হাস্যকর মনে হবে।

ডেভিস বলেন, যখন তিনি প্রথমবার ডাক্তার দেখান, তখন সেই ডাক্তার তার উপসর্গগুলোকে জরুরি মনে করেননি। সে সময় তিনি কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো থেকে বাঁচার ব্যাপারে একটি অনলাইন গ্রুপের সমর্থন পেয়েছিলেন। ডেভিস ও অন্যদের তত্ত্বাবধানে সেই গ্রুপে ৬৪০ জনের মাঝে একটি অনানুষ্ঠনিক জরিপ চালানো হয়। যেখানে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গের কথা বলেন। যেখানে বুক ব্যথা থেকে শুরু করে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সমস্যাও ছিল। অবশ্য কেবল ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা কভিড-১৯ আক্রান্ত ছিলেন। ডেভিসের মতো কেউ কেউ শুরুর দিকে টেস্ট করাতে পারেননি কারণ, তখন টেস্ট কেবল মারাত্মক অসুস্থদের জন্য বরাদ্দ ছিল (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাদের হাসপাতলে ভর্তি করা হয়েছিল তাদের জন্য)। ডেভিস এক মাস পরে টেস্ট করে নেগেটিভ এলেও উপসর্গের ভিত্তিতে ডাক্তার তার কভিড-১৯ পজিটিভ ছিল বলে জানান।

ভাইরাল সংক্রমণ এবং এমই/সিএফএস

ক্লান্তি ও অবসাদ ভাইরাল সংক্রমণের পর একেবারে অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এটা সাধারণত কেটে যায়। তবে একত্র করা কিছু প্রমাণ বলছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ভাইরাস চালিত হতে পারে মায়ালজিক এনসেফালোমিলাইটিসকে লক্ষ্য করে। একটি স্বতন্ত্র ক্লিনিক্যাল সিনড্রোম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয় স্থায়ী ক্লান্তি দ্বারা। ব্যায়াম বা মানসিক পরিশ্রমের পর তা আরো খারাপ হয়। অনেক ডাক্তার এটাকে পোস্ট-এক্সেরশনাল মালাইস বলে। একটু হাঁটাও এমই/সিএফএস আক্রান্তদের কয়েক সপ্তাহের জন্য শয্যাসায়ী করে রাখতে পারে।

আলাইন মোরেউ নামে এক বিশেষজ্ঞ বলেন, অন্য কোনো অবস্থায় আপনি এটি দেখবেন না। আমাদের বাসায় অবস্থান করা একদল রোগী আছে। যাদের এমনকি গোসল করতেও কয়েক ঘণ্টা লেগে যায় কিংবা কখনো কখনো তারা তা করতেও পারে না। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট ম্যাডি হোরিং যোগ করে বলেন, এই রোগের ক্ষেত্রে মনোযোগের অক্ষমতা কিংবা ব্রেইন ফগও খুব সাধারণ বিষয়। এই রোগ সাধারণত পরিচিত ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম কিংবা সিএফএস হিসেবে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই ডাক্তার ও গবেষকরা বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। ডাক্তাররা অনেকগুলো রোগ নির্ণয়ের বিষয়কে বাতিল করেন। যেমন ভাইরাল সংক্রমণ কিংবা স্নায়ুবিক রোগ এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সেসব রোগীর কোনো সমস্যা নেই। অনেক সময় তাদের কেবল ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়া হয়, যা অনেক সময় পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে।

এর আগে সার্স মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর টরন্টোতে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেঁচে যাওয়াদের মাঝে ক্লান্তি হচ্ছে সাধারণ সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে যাদের ১৭ শতাংশই এখনো কাজে ফিরতে পারেনি। এমনকি সংক্রমণের তিন বছর পরও অনেকের মাঝে ব্যথা ও ক্লান্তির উপসর্গ ছিল।

এমন কিছু মোরেউকেও কিছুটা সন্দেহের মাঝে ফেলে দিয়েছে যে সার্স-কোভ-২ অনেক মানুষকে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতায় ফেলে দেবে।

রহস্যময় প্রক্রিয়া

যদিও গবেষকরা ব্যাপকভাবে এমই/সিএফএস রোগীর রক্তে সক্রিয় ভাইরাসের প্রতিলিপি খুঁজছেন, কিন্তু এখনো পাননি। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অভাবনীয়ভাবে উচ্চস্তরের নির্দিষ্ট প্রদাহচালিত অণু পেয়েছেন, যেমন ইন্টারফেরন গামা কিংবা অন্য সাইটোকিনস। যা কিনা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইমিউন সিস্টেমের সম্ভাব্য চিহ্ন। এমন অনেক রকম রহস্য প্রক্রিয়া গবেষক ও ডাক্তাররা লক্ষ করেছেন। হর্নিং বলেছেন, গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মনকে উন্মুক্ত রাখা।

নাথ ও মোরেউ দুজনই কভিড-১৯-এর রোগীদের সেরে ওঠা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুরু করেছেন। তারা মহামারীকে দেখছেন এমই/সিএফএসের কারণ ব্যাখ্যা এবং এর চিকিৎসার উপায়গুলো বের করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। তারা এটাকে কেবল কভিড-১৯-এ বেঁচে যাওয়াদের সুবিধা হিসেবে দেখছেন না, বরং লাখো মানুষ যাদের এরই মধ্যে এমই/সিএফএস আছে তাদেরও কেন হয়েছিল সেটিও জানতে চান তারা।

দ্য সায়েন্টিস্ট