করোনাভাইরাস মহামারীর প্রথম সপ্তাহে সে সময়ের বিভ্রান্তিকর সংবাদগুলো আমি নিতে পারছিলাম না। কেবল এর অন্তর্নিহিত অর্থহীন বোধের জন্য নয়, এটা জানার আসলে কী অর্থ হতে পারে যে জীবাণুর যে দুনিয়ায় আমরা বাস করি তা আসলেই আমরা এড়াতে পারতাম কিনা? আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আসলে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ছিল। যতই আমি পড়ছিলাম বিধ্বংসী নতুন ভাইরাসের সতর্কবার্তা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি, ততই আমার মনে পড়ছিল এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। সে সময় অল্প কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক সাংবাদিক সেই সতর্কবার্তা সম্পর্কে লিখেছিল। আমি তাদের একজন ছিলাম।
১৯৯০ সালে ‘এমার্জিং ভাইরাসেস’
নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করেছিলাম। এই টার্মটি শুরু করেছিলেন ভাইরোলজিস্ট স্টেফান মোরসে। তিনি ছিলেন আমার বই ‘অ্য ড্যান্সিং মেট্রিক্স’-এর প্রধান চরিত্র।
মোরসে এবং অন্য বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করেছিল। যা ছিল জলবায়ু পরিবর্তন, গণনগরায়ণ, কৃষিক্ষেত ও বন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সান্নিধ্য যা কিনা ভাইরাসের আধার। সেখানে এমন জীবাণুর উন্মেষ ঘটিয়েছিল যার সঙ্গে মানবসমাজ পরিচিত ছিল না এবং তা অস্বাভাবিকভাবে মারাত্মক হতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছিল, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিমান ভ্রমণের সহজ সুযোগ, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কারণে শরণার্থীদের চলাফেরা এসব মরণঘাতী ভাইরাসকে সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারে।
জশোয়া লেডেরবার্গের একটি কথা আমি বেশ ব্যবহার করতাম। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে মানুষের চলমান আধিপত্যের একক বৃহত্তম হুমকি হচ্ছে ভাইরাস।
যখন যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা এক হাজারেও পৌঁছেনি এবং আমার মতো নিউ ইয়র্কররা সরকারের কাছ থেকে তিনদিনের জন্য ঘরে থাকার নির্দেশ পেয়েছিল তখন আমি মোরসেকে ফোন করেছিলাম। তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মাইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথে এপিডেমিওলজি নিয়ে পড়ান। সে সঙ্গে বর্তমানে তিনি এমন বয়সসীমায় আছেন যা কিনা করোনাভাইরাসের দিক থেকে ভয়ংকর (আমিও নিজেও তা)। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনই সে সময় কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। আমিও নিজেও তাই ছিলাম।
মোরসে আমাকে বলেন, আমি হতাশ। হ্যাঁ এতকিছুর পরও আমরা ঠিকভাবে প্রস্তুত হতে পারিনি এবং আমরা এখনো অস্বীকারের অন্ধকারে নিমজ্জিত আছি। সে সময় মোরসে ম্যানেজমেন্ট গুরু পিটার ড্রাকারের একটি বাণীও উচ্চারণ করেন। একবার ড্রাকারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনার সবচেয়ে বাজে ভুল কী হতে পারে? মোরসের মতে তার উত্তর ছিল, অকালে সঠিক হওয়া।’
মোরসে কিংবা আমি আমরা কেউ সঠিক ছিলাম না, অকালেও না অন্য কোনোভাবেও না। কেউই ছিল না। আমার বইয়ের জন্য আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম পরবর্তী মহামারী কী? বেশির ভাগ উৎস বলেছিল এটা হবে ইনফ্লুয়েঞ্জা। সেই ফোন কলে মোরসে বলেছিলেন, তিনি সবসময় জানতেন পরবর্তী মহামারী যেকোনো জায়গা থেকে আসতে পারে। তবে ৯০ দশকের শুরুতে তিনি এবং তার সহকর্মীরা গুরুত্ব দিয়েছিলেন ইনফ্লুয়েঞ্জার ওপর। সম্ভবত এটা ভুল ছিল। যদি পরবর্তী মহামারী ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় তবে তা খুব বেশি আঘাত হানতে পারে না। মানুষ প্রতি বছর এটার মুখোমুখি হয়। আমাদের সেটার ভ্যাকসিনও আছে।
তাই এই সতর্কবার্তাকে কেবল ফ্লু বলে খারিজ করে দেয়া যায় অথবা বিপর্যয়ের ভাবনাকে একজন লেখকের অতিমাত্রায় উত্তেজিত চিন্তার ফসল বলে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। অবশ্য এরপর আরো কিছু বিখ্যাত বই বাজারে এসেছিল। যাদের কোনোটা বেস্ট সেলারও ছিল। সবগুলোয় ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সেই একই কথা, আমরা বেশ বাজেভাবে অপ্রস্তুত। তবে কেন তার একটিও যথেষ্ট ছিল না?
প্রয়াত এডউইন কিলবোর্নে এ সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন গবেষণার একজন পথিকৃৎ ছিলেন। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝিতে তিনি একটি কাল্পনিক ভাইরাসের ভয়াবহতার কথা বলেছিলেন। তিনি একে দানব ভাইরাস বলে অভিহিত করেছিলেন। এটা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বাতাসে ছড়াতে পারে।
নভেল করোনাভাইরাস কিলবোর্নের সেই ভাইরাস না হলেও এটিতে সে ভাইরাসের ভয়ংকর অনেকগুলো দিক রয়েছে। এটা বাতাসে ছড়াতে পারে, শ্বাসনালিতে এটি প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এবং এটি কয়েকদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। যা কিনা একে ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর করে তুলেছে।
আমাদের মতো দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) বৈশ্বিক মহামারীর হুমকিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি। এর আগে আমরা অনেক বড় হুমকির মুখোমুখি হয়েছিলাম যার অবস্থান দূরবর্তী ছিল। তখন আমাদের মনে হতে পারে যে এটা আমাদের জন্য নয়। আমাদের বেশির ভাগই উটে চড়ে না, বানর খায় না, জীবনে বাদুড় নিয়ে কাজ করে না অথবা বনরুইও বাজারে কেনাবেচা করে না। ‘অপরায়নের’
মূলত অনেক ধরনের হুমকি রয়েছে। আমি একবার এক ফিল্ড ভাইরোলজিস্টকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কোন বিষয়টি মহামারীকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে? সে উত্তর দিয়ে বলেছিল, একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের মৃত্যু।
তার পরও বইয়ে গত শতাব্দীর মহামারীর গল্পগুলোতে অনেক কিছু শেখার আছে। কখন একটি ভাইরাসের উত্থান ঘটছে, কীভাবে তা মানুষের মাঝে ছড়াচ্ছে এবং কীভাবে এটি শেষ হচ্ছে। যদিও ১৯১৮-১৯ সালের পর এত বড় আকারে মহামারী আর দেখা যায়নি। তাই বলা যায়, নব্বইয়ের দশকে আমরা সঠিক শিক্ষা প্রায় পেয়েই গিয়েছিলাম এবং তারপর তা আমরা এড়িয়ে যাই। খুব সম্ভবত এবার ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হলো এবং
এর শিক্ষাও সেটাই থাকল।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে সংক্ষেপে অনূদিত





