এই কয়দিনে বেশ কয়েক জায়গা থেকে ফোন পাবার পর আমার অভিজ্ঞতা একই সাথে বেশ সুখকর এবং কষ্টের। ভালো লেগেছে এই কারণে যে মানুষ অন্তত মনে রেখেছে যে সে মানুষ। আর কষ্টের কারণ হল বেশ কিছু মানুষকে ইচ্ছে থাকার পরও মানা করতে হয়েছে। বেশ অনেকদিন হল এই ত্রাণ বিতরণ চলছে সাথে চলছে তৎসংশ্লিষ্ট অর্থ জোগানের এক বিপুল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু আমার কথা হল বেসরকারি এবং সরকারি পর্যায়ের এই বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের জন্য কতদিন পর্যন্ত আমরা আসলে অর্থের জোগান ঠিক রাখতে পারব। 

এখানে ভুলে গেলে চলবে না বৈদেশিক সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম বা তা পেলেও তার পরিমাণ কম হওয়ার আশঙ্কা করা বাস্তবিকই, কেননা গোটা বিশ্বই করোনায় জর্জরিত। কিন্তু তাই বলে তো আর এই দুস্থ অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করা যাবে না। যেহেতু তাদের সাহায্য করার মাধ্যমে আমরা আদতে সাময়িকভাবে তাদের উন্নয়ন সাধনই করছি। তাই আমার মতে এই উন্নয়ন হওয়া উচিত টেকসই। এভাবে ক্রমাগত তাদের খাদ্যের জোগান না করে বরং এমন কিছু করা উচিত যার মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের অর্থনীতির চাকা নিজেরাই সচল রাখতে পারে। 

অনেকেই বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করছেন। কিন্তু আমার যে বিষয়টাতে খটকা লেগেছে তা হল, এভাবে কতদিন পর্যন্ত সংগ্রহ চালু রাখা যাবে আবার যখন ব্যপারটা কঠিন হয়ে যাবে তখন যাদের জন্য এই এত আয়োজন তাদের অবস্থা কী হবে? এখন প্রশ্ন হল শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বললে তো হবে না। একটা সমাধান সূত্র নিয়েও ভাবা দরকার। এই সমস্যার সমাধানকল্পে কিছু নতুন কাজ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এ ব্যপারে উন্নয়ন ক্ষেত্রে যারা বহুদিন কাজ করছেন তাদেরকে নতুন করে ভাবতে হবে। এই নির্দিষ্ট অনুষঙ্গকে মাথায় রেখে এবং এও ভাবতে হবে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে টেকসই উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব। 

এ ব্যাপারে সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এই প্রান্তিক জনগণ যাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে তা খরচ করা হচ্ছে তা দিয়ে একেবারে ছোট আকারে ঐ নির্দিষ্ট সঙ্কটকে কেন্দ্র করে কোনো উদ্যোগ তৈরি করা যেতে পারে। এখন যেমন রাস্তার মোড় মোড়ে মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস বা হ্যান্ড স্যনিটাইজার বিক্রির হিড়িক পড়ে গেছে, এই বিষয়টাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। আমরা প্রাথমিকভাবে প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে কিছু দরিদ্র পরিবারকে মানসম্পন্ন মাস্ক, পিপিই, গ্লাভস বা হ্যান্ড স্যনিটাইজার সরবরাহ করে তাদের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় তা বিক্রির ব্যবস্থা করে দিতে পারি। মানের বিষয়টি নিশ্চিতের ব্যাপারে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বিপণনের বিষয়টি এখানে খুব বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে কিনা তা নিয়ে ভাবার জন্য এই বিষয়ে যারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ তাদের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। অন্যকেউ যাতে এই সুযোগে তাদের মানহীন পণ্য এই উদ্যোগের আড়ালে বিক্রি করতে না পারে সে জন্য ব্যাজ বা আইডি কার্ডের মাধ্যমে আমরা যেসব ব্যক্তিদের কাছে বিক্রেয় বস্তু সরবরাহ করছি তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারি। সফলতা সাপেক্ষে পরিচয় নিশ্চিতকারী আলাদা পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবস্থা করাটাও বেশ কার্যকর হবে বলে মনে হয়। 

আমাদের প্রাথমিক কাজ হবে উপরোক্ত পণ্যগুলোর উৎপাদকের কাছ থেকে সেগুলো কেনা। ত্রাণ বিতরণের জন্য যে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল তা এই প্রাথমিক অর্থায়নের জন্য ব্যয় করাটা কাজ করবে প্রাথমিক মূলধন হিসেবে। এখন এই পণ্যগুলো আমরা বিতরণ করব যাদেরকে ত্রাণ দেয়ার কথা তাদের মাঝে। তারা পূর্বনির্ধারিত স্থানে ওই পণ্য বিক্রি করে যে অর্থ আয় করবে তা থেকে প্রয়োজনমত রেখে বাকিটা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে আবার ওই একই পণ্য নিয়ে যাবে। আমরা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান থেকে আবার ওই অর্থের মাধ্যমে নতুন পণ্য সংগ্রহ করব। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার লাভ করব না। বিক্রিত অর্থ থেকে প্রয়োজনমত অর্থ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য রেখে বাকিটা দিয়ে ব্যবসা করার মাধ্যমে এরা একটি অর্থনৈতিক চক্রের মধ্যে ঢুকে যাবে। 

আবার আমরা চাইলে মাঝখান থেকে কিছু লাভ রাখতে পারি যা দিয়ে নতুন নতুন মানুষদের এই অর্থনৈতিক চক্রের মাঝে স্থান দিতে পারব। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ মানসম্পন্ন পণ্যের নিশ্চয়তা পাবে সেই সঙ্গে কিছু দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ পাবে অন্নের নির্দিষ্ট জোগানের পথ। আবার তাদের লাভের টাকা দিয়েই আরও মানুষকে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

প্রাথমিকভাবে এ ধারণা শহরকেন্দ্রিক হলেও গ্রামে এর ভিন্ন বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আশা করি। আমি শুধু জানি এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর না আনলে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। শুধু ত্রাণ বিতরণ কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। 

সৈয়দ রাইয়ান আমীর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

raiyanamir@gmail.com