চলমান করোনা মহামারীর মধ্যে কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন দেশের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা (নেফ্রোলজিস্ট)। এই সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাবের মধ্যে কভিড ও নন-কভিড রোগীদের কিডনি জটিলতার চিকিৎসা, ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন চিকিৎসায় উদ্ভুত চ্যালেঞ্জ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সঙ্কট নিয়ে কথা বলেছেন তারা।
কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রোলজিস্টের (আইএসএন) তরুণ সদস্যদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তরুণ আইএসএন সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ, ঘানা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, মালাবি, বলিভিয়ার তরুণ চিকিৎসকরা।
বাংলাদেশ থেকে আইএসএন ফেলো হিসেবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছের ঢাকার ইউনাইটেড হসপিটালের নেফ্রোলজিস্ট কনসালটেন্ট তানিয়া মাহবুব।
তিনি বলেছেন, কভিড-১৯ যেহেতু নতুন রোগ এ কারণে সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী এই রোগের ব্যবস্থাপনাতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
মার্চের শুরুর দিকে যখন হাতেগোনা কয়েকজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন তখনই মূলত প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের এই নতুন রোগের ব্যাপারে ধারণা দেয়া, ব্যবস্থাপনা শেখানো এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত করার কাজ করা হয়।
ডায়ালাইসিস বা অন্য সমস্যা নিয়ে যেসব রোগী এসেছেন প্রাথমিকভাবে তাদের পরীক্ষা করাটাই প্রথম ও জরুরি কাজ। কভিডের মতো উপসর্গযুক্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোগীকে সরাসরি পরামর্শ দেয়ার সুযোগ খুব সীমিত। প্রত্যক্ষ পরামর্শের মাধ্যমে রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করতে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস ইউনিটকে সংক্রমণের চরম সম্ভাব্য স্থান বিবেচনায় কঠোর দৃষ্টি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদেরও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে এবং সরাসরি না এসে টেলিমেডিসিন সেবা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
মহামহারীর সময় যতোটা সম্ভব সংক্রমণ ঝুঁকি এড়িয়ে স্বাভাবিক ডায়ালাইসিস কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। জরুরি ডায়ালাইসিসের জন্য আমরা ইন্টারনাল জাগুলার রুটের পরিবর্তে ফেমোরাল ভেনাস ক্যাথেটারাইজেশন করছি। এক্ষেত্রে অবশ্যই পিপিই পরিধান করে রোগীর কাছে যাওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে দেশে কভিড হাসপাতাল সুনির্দিষ্ট করা হয়েছিল। কিন্তু গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হয়ে গেলে সরকার সব হাসপাতালে কভিড রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তখন আমাদের মূল হাসপাতালকে কভিড এবং নন-কভিড এই দুটি অংশে বিভক্ত করতে হয়েছে। আরটি-পিসিআর মেশিনও বসানো হয়েছে। সিসিইউতে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যেসব কভিড রোগীর ডায়ালাইসিস দরকার তাদের জন্য নেগেটিভ প্রেসার আইসোলেশন চেম্বার করা হয়েছে।
আমার অভিজ্ঞতায়, কভিড এবং নন-কভিড রোগীদের একই চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া একটা চ্যালেঞ্জিং কাজ। বিশেষ করে যখন আরটি-পিসিআর মেশিন যথেষ্ট থাকে না এবং পরীক্ষার ফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
দুঃখজনকভাবে অনেক রোগী রোগের প্রকৃত ইতিহাস গোপন করেন। তাদের কারণে চিকিৎসকরা অত্যন্ত ঝুঁকিতে পড়েন। বিস্তৃত গোষ্ঠী সংক্রমণ হয়ে গেছে। রোগীদের মধ্যে এখন আলাদা আলাদা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে এবং পরীক্ষার পর জানা যাচ্ছে তিনি কভিড পজিটিভ। এমনকি তীব্র উপসর্গ থাকার পরও কারো কারো প্রাথমিক পরীক্ষায় নেগেটিভ আসছে। পরের পরীক্ষায় হয়তো পজিটিভ আসছে। ফলে রোগী দেখার সময় অবশ্যই এন৯৫ বা এই মানের মাস্ক পরাটা জরুরি বলেই আমি মনে করি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে করোনায় চিকিৎসকদের মৃত্যু অনেক বেশি। খুব কম সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। আমি মনে করি, তাদের সংক্রমিত হওয়া এবং এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান অগ্রাধিকারভিত্তিতে করা দরকার।
ঘানার নেফ্রোলজিস্ট এলিয়ট কোরান্তেং তানোর তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ১২ মার্চ দুই জন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর থেকে সংক্রমণ বাড়ছেই। আক্রান্তের হারের দিক থেকে আফ্রিকায় তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘানায়। এর আগে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মরক্কো।
করোনার সংক্রমণ বিস্তার রোধে সরকার কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথম আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার ১০ দিন পর ২২ মার্চ থেকে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বেশি আক্রান্ত এলাকাতে ৩০ মার্চ থেকে টানা তিন সপ্তাহের আংশিক লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সংক্রমণ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে লকডাউন তুলে নিতে হচ্ছে। এরপরও গণজমায়েতে নিয়ন্ত্রণ রেখেছে সরকার। এবং মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে। স্কুলগুলোও একে একে খুলছে।
আমার উদ্বেগের বিষয় হলো, সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। আর তখন পরিস্থিতি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। বেশিরভাগ হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মী কমে গেছে, যেখানে প্রায় ১০০ চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন দুই জন। এর মধ্যে একজন প্রখ্যাত নেফ্রোলজিস্টও আছেন।
স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অনীহা দেখা যাচ্ছে তাতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর তখন নন-কভিড রোগীরও বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কারণ সেলফ আইসোলেশনে যাওয়ার কারণে এরই মধ্যে চিকিৎসক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
এর মধ্যে চলতি বছর ঘানার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ৩০ জুন থেকে শুরু হয়েছে ভোটার নিবন্ধন। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বরে।
নেফ্রোলজিস্ট তাতিয়ারা বুয়েনো বলেন, তিন মাস আগে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের মানুষ ভেবেছিল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অনেক দূরে, তাদের দেশে আসার সম্ভাবনা কম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলেও হানা দিয়েছে এবং ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি অ্যামাজনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসীরা পর্যন্ত ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন।
তাতিয়ারা বলেন, দ্রুত নতুন আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, ব্যবসা বাণিজ্য সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু সব প্রচেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দিয়ে ব্রাজিলে সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে স্থূলকায় এবং পুরুষ রোগীদের অবস্থা গুরুতর হচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সব আইসিইউ বেড পূর্ণ হয়ে গেছে। বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য কিডনি রোগের চিকিৎসা দরকার হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরে নিতে হচ্ছে তাদের ডায়ালাইসিস লাগছে।
দিন দিন চ্যালেঞ্জ আরো কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসা ও সুরক্ষা সরঞ্জামেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রায় সবাইকে ওভারটাইম করতে হচ্ছে।
ডায়ালাইসিস ক্লিনিকে করোনার সংক্রমণ বিস্তারের বিপদ বেশি। এখানে রোগী থেকে স্টাফদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন।
তবে সব দুঃখ বেদনা ও ক্লান্তির মধ্যেও সবচেয়ে সুখের কথা হলো, অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী টিমওয়ার্ক দাঁড়িয়ে গেছে। এই মহামারী একদিন শেষ হবে, তখন পেছনে ফিরে এই সহযোগিতামূলক কর্মতৎপরতার স্মৃতি স্মরণ করে আমরা ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা পাবো!





