আগামী পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ বার্তা নিয়ে প্রাণঘাতী সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯)। সারা বিশ্বে প্রতিদিনই সংক্রমণের সংখ্যার পাশাপাশি বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। মহা আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ইনেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রাণহানি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বেশি আলোচিত হচ্ছে। কোন খাতে আর্থিক ক্ষতি কতটা, তার হিসাব হচ্ছে বারবার। বৈদেশিক বাণিজ্যে দেশের সবচেয়ে বড় খাত গার্মেন্ট শিল্পের জন্য এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রণোদনা ঘোষিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য খাতও প্রণোদনা চাইতে শুরু করছে। কিন্তু সমস্যার মর্মমূলে হচ্ছে না আলোচনা। আর্থিক ক্ষতি ও প্রাণহানির হিসাব কষতে গিয়ে আমাদের উপলব্ধিতেই আসছে না যে বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর জন্য অসংগতিপূর্ণ আর্থিক উন্নয়ন ও প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ডই দায়ী। এ মহামারী জানান দিচ্ছে এটি প্রকৃতিরই এক প্রতিশোধ। এর বিপরীতে আমাদের সমাজে মন-মগজ-মানসিকতায় মূঢ়তা গভীরভাবে মূলীভূত। নভেল করোনাভাইরাস আগামীতে বহু প্রাকৃতিক প্রলয়ের একটি ইঙ্গিত।

কভিড-১৯ নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এর অস্তিত্ব আগেও ছিল। মানব করোনাভাইরাস প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে। ২০০২-০৩ সালে বিশ্বে মহামারী হয়ে এসেছিল সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। ২০১২ সালে তার চেয়েও ভয়ংকর প্রাণঘাতী ছিল মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। এর মাঝে একাধিকবার আসা-যাওয়া করেছে বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লুর মতো সংক্রমণ। তবে কভিড-১৯ এখন বিশ্বজুড়ে মহামারী বা প্যানডেমিক পর্যায়ে। কয়েক হাজার বিজ্ঞানী নভেল করোনাভাইরাসের উত্স শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে কঠোর পরিশ্রম করছেন। এটি কেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি আগের নভেল করোনাভাইরাসই, শুধু বদলে গেছে এর জিনের গঠন। ক্ষুদ্র শরীরে একের পর এক রাসায়নিক বদল ঘটিয়ে সে এখন অপ্রতিরোধ্য। যেকোনো সাধারণ ভাইরাস ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে যদি তার ভেতরে একাধিক মিউটেশন হয়। অর্থাত্ বদলে যায় জিনের গঠন। সাধারণ ফ্লুর ভাইরাসও তখন হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। নভেল করোনাভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এর মধ্যকার ২৭টি ভাইরাল প্রোটিনের রাসায়নিক বদল হয়েছে। ৩৮০ বার মিউটেশন অর্থাত্ জিনের গঠন বদলে গেছে।

ভাইরাস কীভাবে মানবশরীর উপযোগী পোষক হিসেবে একের পর এক সংক্রমণের ঘটনা ঘটায়? সার্সের পর মার্স, এরপর নিপাহ, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু। এদিকে আবার ডেঙ্গুর পর চিকুনগুনিয়া। এরপর এল আরো মরণঘাতী রূপের ডেঙ্গু। কেন প্রকৃতি আজ বিমুখ হচ্ছে দাম্ভিক সভ্যতার প্রতি? একমাত্র মানুষ প্রজাতি প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করায় আজ প্রকৃতি ক্রমে বিরুদ্ধাচরণ করছে। সার্স থেকে শুরু করে কভিড-১৯ পর্যন্ত প্রায় সব ভাইরাস প্রাণীদেহ থেকে মানুষকে আক্রান্ত করেছে। ভাইরাস অতি ক্ষদ্র অনুজীব। সাধারণত জীবদেহের বাইরে জড় বস্তুর ন্যায় আচরণ করে। জীবদেহে প্রবেশ করলে বংশবৃদ্ধি করে। এটি জীব ও জড়ের মাঝামাঝি অবস্থান। ভাইরাস নিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত অতি ক্ষুদ্র অকোষীয় পরজীবী। এরা অভিযোজন ও প্রকরণ সৃষ্টিতে প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী। এরা বন্যপ্রাণী বিশেষ করে স্তন্যপ্রাণী থেকে স্বল্প জিনগত পরিবর্তনেই মানবশরীরে আসতে সক্ষম হয়। আমরা জানি সার্স, সিভেট, নিপাহ ভাইরাস বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। মার্স ভাইরাস উট থেকে, সোয়াইন ফ্লু শূকর থেকে এবং বার্ড ফ্লু মুরগি বা পাখির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে। প্রকৃতি হরণে-হননে পরিবেশ বিপর্যয়ে বন্যপ্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসায় এসব বিপত্তি। আর সেসব ভাইরাস বেশির ভাগই চীন থেকে ছড়িয়েছিল। কিন্তু কেন? চীনে অধিক জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটাতে চলে প্রকৃতির লুণ্ঠন, নিষ্পেষণ। কভিড-১৯ চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে কাঁচা মাংসের বাজারের কর্মীর মাধ্যমে প্রথম ছড়ায়। যেখানে প্রচুর বন্যপ্রাণীর কাঁচা মাংস বিক্রি হয়। জানা যায় বনরুইও চোরাচালানের মাধ্যমে বিক্রি হয়। সেখানে কাঁচা মাংসের চাহিদার জন্য প্রচুর বন্যপ্রাণীর খামারও গড়ে উঠেছে। নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকার সেই মার্কেট জানুয়ারি ১ তারিখেই বন্ধ করে দিয়েছে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যখন কোনো ভাইরাস আক্রান্ত বন্যপ্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসে তখনই আক্রান্ত হতে শুরু হয়। আর যখন মানুষ প্রকৃতিকে লুণ্ঠন, ধ্বংস করে, তখন এসব প্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসে। 

আজ দাম্ভিক সভ্যতা মানুষের জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে প্রায় ব্যর্থ। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশের সমষ্টিই হলো মানবপরিবেশ। মানবপরিবেশ ভৌত, জীবসংক্রান্ত এবং সামাজিক শর্তগুলো দ্বারা গঠিত। এ শর্তগুলো নিজেদের মধ্যে এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। এ শর্তগুলো মানুষের ব্যাধি বা রোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত; যা চরম বিচ্যুত হলে প্রজাতির বিপর্যয়-বিলুপ্তি ঘটায়। সতেরো শতকে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে মাত্র ৪০০ বছরে যন্ত্র সভ্যতা প্রকৃতি ও পরিবেশের অসীম ক্ষতি করেছে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে তা এখন চরম পর্যায়ে। পুঁজিবাদের ধারায় ভোগবাদের তাড়ানায় মানুষ বুদ্ধি আর বাহুবলে ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকৃতিকে শোষণ ও লুণ্ঠন করেই যাচ্ছে। 

অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে উন্নয়ন দর্শন নিয়ে মানুষকে নতুন করে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে প্রকৃতি সংরক্ষণের কথা। কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, কেবল কমিউনিজমেই এ সংকটের নির্মূল সম্ভব, যখন ‘মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ ও মানুষ কর্তৃক প্রকৃতি শোষণের অবসান ঘটবে।’ উন্নয়ন ভাবনায় আমেরিকান তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও পরিবেশবাদী মারে বুকচিন ‘সামাজিক বাস্তুবিদ্যা’ নামে ১৯৮৭ সালে এক তত্ত্বের অবতারণা করেন। সামাজিক বাস্তুশাস্ত্রটি সমাজ ও বাস্তুসংস্থানের ধারণার সংযোগ প্রতিষ্ঠা করে। প্রকৃতি ও সমাজ বিশ্লেষণে তত্ত্বটি বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এবং ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে মানবপ্রকৃতি ও জৈবিক প্রকৃতি সম্পর্কিত। তার মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অসংগতি বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই মানব ও অমানব ক্রিয়াগুলোর কারণে উত্পন্ন পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনর্নির্মাণে মানুষ প্রকট ভূমিকা পালন করেছে। ফলে মানব ও অমানব জীবন আরো সমস্যাযুক্ত হয়ে পড়ে। মার্ক্সবাদী এই দার্শনিক সমাজ ও প্রকৃতিকে সমন্বিতভাবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রক্রিয়ায় সমাজকে প্রথম প্রকৃতি, দ্বিতীয় প্রকৃতি এবং মুক্ত প্রকৃতি ধাপে ভাগ করেছেন। প্রথম প্রকৃতি হলো আদিম যুগ। সেখানে জৈবিক বা প্রাকৃতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল, যা কিছুর পরিবর্তন তা বিবর্তন প্রক্রিয়ায় হয়। প্রথম প্রকৃতি থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষ তার শারীর ও বুদ্ধি বল অর্জন করে সমাজ গঠন করে। গড়ে ওঠে মানবীয় আধিপত্য আচরণ দ্বারা প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, দল, রাষ্ট্র, সম্প্রদায়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আধিপত্য পরম্পর বিদ্যমান। আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় একে অন্যকে শাসন-শোষণ করতে প্রকৃতিকে পুনর্গঠন ও বিনাশ করেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের প্রকৃতিতে কারণ, প্রভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ উপলব্ধি নেই বলেই মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপে চরম বিপর্যয় হতে পারে। তাই তিনি আধিপত্য পরম্পরা ভেঙে মুক্ত প্রকৃতি পর্যায়ে প্রবেশের মধ্য দিয়ে আরো বেশি সমতাবাদী সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের ওপর জোর দেন, যা স্বতন্ত্র লাভের পরিবর্তে সাম্য ও সহযোগিতামূলক মিথজীবী বা সিম্বায়োসিস প্রক্রিয়ায় সমাজ পরিচালিত করার কথা বলে। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে সমাজের আন্তঃসম্পর্ক হবে অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতিতে প্রতিটি জীবের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এ সম্পর্কে দার্শনিক ও বাস্তুসংস্থানবাদী আরে নেস ‘ডিপ ইকোলজি বা নিবিড় প্রতিবেশবাদ’-এর কথা বলেছেন। প্রকৃতিতে মানুষের ন্যায় প্রতিটি জীবের সমান অধিকার রয়েছে টিকে থাকার এবং প্রত্যেক জীব পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। আবার ভারতীয় বৈদিক দর্শনেও প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করার কথা বলা আছে। তাই আমাদের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক দর্শনভিত্তিক সমাজ গড়তে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির, বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের, দর্শনের সঙ্গে সাহিত্যের, পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে শিক্ষার, নগরায়ণের সঙ্গে গ্রামের সামঞ্জস্য বিধান করতে হয়। আমাদের সমাজেও পরিবেশ-প্রকৃতি বিষয়ে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা একেবারেই গৌণ। আমরা আশৈশব শোনা কথায় অলীক-অলৌকিক আস্থা-ভয়-ভক্তি-ভরসায়, ভাবে-চিন্তায়, কর্মে-আচরণে অবিচল। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় কালের বিবর্তনের সঙ্গে বিকাশের পরিবর্তে আজও সমাজ পশ্চাত্মুখী হয়ে মূঢ়তার মর্মবাণী প্রচারে অভ্যস্ত। অসংখ্য অসামঞ্জস্যে ও অযৌক্তিক-অন্ধবিশ্বাসে ভ্রান্ত চিন্তা সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে। বিজ্ঞান-জ্ঞান-বুদ্ধি-যুক্তি মূল্যহীন। ফলে অযৌক্তিক অন্ধবিশ্বাস উদভ্রান্ত গুজব সহজেই ছড়ায়। এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মানুষ মধু-আদা-কালোজিরা খাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন থানকুনি পাতা খাওয়ার কথা। এমনকি কেউ বলছেন তুলসী গাছের বা দরজার নিচে মাটি খুঁড়ে কয়লা পাওয়া গেলে তা ধুয়ে পানি খেলে তিনি নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন না। অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে তৈরি হয়েছে এক বিশাল গণহিস্টিরিয়া। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাধারণভাবে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, অল্পশিক্ষিত, শিক্ষার সুযোগ লাভে বঞ্চিত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে এবং শোষিত শ্রেণীর মানুষদের মধ্যেই ‘হিস্টিরিয়া’ রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ শ্রেণীর মানুষের মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের সহনশীলতা কম। এরা একনাগাড়ে একই কথা শুনলে, ভাবলে বা বললে মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু কোষ বারবার উত্তেজিত ও আন্দোলিত হতে থাকে। অনেক সময় উত্তেজিত কোষগুলো অকেজো হয়ে পড়ে, অন্য কোষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। ফলে মস্তিষ্কের কাজকর্মে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঈশ্বর ভজনা বা জিকির শুনতে শুনতে আবেগে চেতনা হারিয়ে অদ্ভুত আচরণ করাও হিস্টিরিয়ার অভিব্যক্তি। 

সারা বিশ্বে সব মিডিয়ায় এখন একটাই খবর—নভেল করোনাভাইরাস। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে খেলাধুলা, বিনোদনের খবরেও এখন করোনার থাবা হেনেছে। টিভির বিজ্ঞাপনেও এখন করোনার সতর্কতা। আর প্রতিদিন ফেসবুক, মেসেঞ্জারে অজস্র পোস্ট শেয়ারিং হচ্ছে। আমার মনে হয়, একজন মানুষ দিনে ২০০ থেকে ৭০০ বার নভেল করোনাভাইরাসের কথাটি শুনছে এবং অসংখ্যবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মনের মধ্যে। আমার সাড়ে চার বছরের মেয়ে আগে ফুল-পাখি, প্রজাপতির ছবি আঁকত। এখন সে সেই ভাইরাসের ছবি আঁকছে। দুদিন আগে সে আমাকে বলছে, ‘বাবা, বাইরে থেকে কোনো জিনিস নিয়ে এলে মনে হয় সবকিছুর মধ্যেই করোনাভাইরাস আছে।’ এ আতঙ্ক শুধু তারই নয়, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই মনে। ফলে এ ভাবনা, অনিশ্চয়তা মস্তিষ্কের কোষকে একপ্রকার ভয়ে উত্তেজিত করছে। এতে সমাজে মানুষ হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। সংখ্যা যদি অন্য দেশের মতো ভয়াবহভাবে বেড়ে যায় বা বাড়ির পাশে কেউ আক্রন্ত হয় বা মারা যায়, তাহলে কত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে তা কল্পনা করা কঠিন। আর তখন যেকোনো গুজব ছড়িয়ে যাবে বিদ্যুত্গতিতে। তখন গুজব থেকে গণপ্রহারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে। রোগীর চিকিত্সাসহ মরদেহ সত্কার নিয়ে এক ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে, এমন পরিস্থিতিতে সরকার কি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। বর্তমানে করোনা টেস্ট নিয়ে যে অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে, তা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। 

যারা মনে করছেন এ বছরের মধ্যেই ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হলেই মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, বিষয়টা এখানেই শেষ ভাবা যাবে না। এক ভাইরাসের পর আরেক ভাইরাস নতুবা অন্য রোগ-জীবাণুর আবির্ভাব হওয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে প্রকৃতিকে ধ্বংসের মাধ্যমে। আমি উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে এমএস করার সুবাদে অবগত যে যেকোনো অনুজীব প্রতিকূল পরিবেশ বা নতুন পোষকদেহে সংক্রমণে নিজেকে বদলে ফেলে এবং থেমে যাওয়ার ক্ষমতা তার নিজেরও নেই। প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিনই দেয়া হোক না কেন, কিছুকাল পর তার ধরন বদলে ফেললে সেই ভ্যাকসিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। এদিকে একটা সময় পর পোষক তথা মানবশরীরও সেই সঙ্গে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। তাছাড়া ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিষ্কার বা উত্পাদনের মাধ্যমে চলবে আর্থিক শোষণের রমরমা বাণিজ্য। ফলে সম্প্রসারিত হবে শোষণ-শাসনের নতুন ক্ষেত্র। শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিই উত্তম উপায়। দূষণযুক্ত পরিবেশে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। দেশে রাজধানীসহ বড় বড় শহরে প্রচণ্ড বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর ৭০টি স্থানের বায়ু চারবার পর্যবেক্ষণ করে তথ্য পেয়েছে যে ঢাকা শহরের বাতাসে দূষিত বস্তুকণার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) ও দি ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বায়ুদূষণে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ, মোট মৃত্যুর যা ১৪ শতাংশ। এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশীদের আয়ু কমছে গড়ে ১ বছর ১০ মাস। গড় আয়ু কমার এ হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। ফুসফুসজনিত রোগে মৃত্যুর ৪৯ শতাংশ হয় বায়ুদূষণের কারণে। বায়ু, পানি, মাটি, শব্দদূষণে, নদী-নালা জলাশয় দখল ও দূষণে, ভরাটে বন সাবাড় ও পাহাড় ধ্বংস করে অজস্র প্রাণী নির্মূলে পরিবেশ-প্রকৃতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়েছি। আমরা যে সামাজিক নীতি-নৈতিকতাহীন, দৃশ্য-অদৃশ্যে ভয়-ভক্তি-ভরসাভিত্তিক জাতিতে পরিণত হয়েছি, সেখান থেকে বেরিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান-বুদ্ধি-যুক্তি-দর্শনভিত্তিক সমাজ গড়তে হবে। 

রতন মণ্ডল: কৃষিবিদ, কলাম লেখক