বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত ১ মিলিয়ন মানুষ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। গোটা বিশ্বকে আট মাসের বেশি সময় ধরে গ্রাস করে রেখেছে এ মহামারী। ১৩ জানুয়ারিতে করা এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, চীনে রহস্যময় নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে, যার সম্ভাব্য কারণ করোনাভাইরাস। এ মন্তব্যটি করেছিলেন কুইন্স ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজিস্ট কোনোর বামফোর্ড। এর পর থেকে কেবল স্ক্রলডটনেই এ বিষয়ে প্রকাশিত হয়েছে সাড়ে তিন সহস্রাধিক আর্টিকেল। বিশ্বব্যাপী নেতৃস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পরও এ মারণঘাতী জীবাণু নিয়ে কিছু রহস্য এখনো ঢাকা রয়েছে। তেমন কিছু প্রশ্ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হয়েছে নিউজ পোর্টালটি।

কীভাবে সার্স-কোভ-২ মানুষের মাঝে প্রবেশ করেছে?

আমরা যদি পরবর্তী মহামারীকে আটকাতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই জানতে হবে কীভাবে সার্স-কোভ-২ মহামারী মানব সমাজে প্রবেশ করেছে, যেমনটা আমরা করেছিলাম ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে। যদিও মূলত ভাবা হয় যে চীনে হুয়ানান সিফুড মার্কেট থেকে ডিসেম্বরে এটি মানব সমাজে প্রবেশ করে। যদিও বলা হচ্ছে, প্রথম দিকের রোগীর বাজারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, ভাইরাস তার আগেই উদ্ভূত হয়েছিল। তবে এটা আসলে কীভাবে ঘটেছিল?

২০০২ সাল থেকে সার্স করোনাভাইরাসের উত্পত্তি নিয়ে গবেষণা শুরু হওয়ার পর, হর্সশু বাদুড়কে এর উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং একটি ভাইরাস (আরএমওয়াইএন০২) যার সঙ্গে সার্স-কোভ-২-এর অদ্ভুত মিল পাওয়া গেছে, সেটিও এরই মধ্যে বাদুড়ের দেহে পাওয়া গেছে। অবশ্য একই ভাইরাস বনরুইয়ের মাঝেও দেখা গেছে। ফলে সব মিলিয়ে এ সম্ভাবনাও আছে যে হয়তো সার্স-কোভ-২ সরাসরি বাদুড়ের কাছ থেকে আসেনি।

এদিকে সার্স-কোভ-২ এরই মধ্যে বিড়াল, কুকুর ও বাঘের মধ্যেও ছড়িয়েছে। তাই এ সম্ভাবনাও আছে যে সার্স-কোভ-২ একটি সাধারণ ভাইরাস, যা বিবিধ প্রজাতির মাঝে ছড়াতে সক্ষম।

কোনোর বামফোর্ড, রিসার্চ ফেলো, ভাইরোলজি, কুইন’স ইউনিভার্সিটি

কীভাবে বলা যায় কেউ একজন সার্স-কোভ-২ থেকে সুরক্ষিত কিনা?

সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে ইমিউন প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভাইরাসকে শরীর থেকে দূর করা। অনেক গবেষণা সতর্কতার সঙ্গে প্রাথমিক সংক্রমণের পর বিভিন্ন ধাপের ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছে। কিন্তু আমরা জানি না ইমিউনিটির কোন দিকটি সংক্রমণের পুনরাবৃত্তিকে রুখতে পারে। সে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবডির তুলনামূলক ভূমিকা কিংবা ভিন্ন টি সেল সাবসেটের গুরুত্ব সম্পর্কেও।

ইমিউনোলজিক্যাল গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো এটি চিহ্নিত করা যে কোন ইমিউন উপাদান দেখায় যে একজন ব্যক্তি ভবিষ্যতের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত। যাকে ‘কোরিলেট অব প্রটেকশন’ও বলা হয়।

এটি মূলত দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি আমাদের বলে যে কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তির পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা এবং দ্বিতীয়ত, সহজেই পরিমাপ করা যায় এমন ‘কোরিলেট অব প্রটেকশন’ শনাক্ত করা, যা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের জন্য উপযোগী।

সারাহ ক্যাডি, ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফেলো, ভাইরাল ইমিউনোলজিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ

মৃত্যুহারের ক্ষেত্রে চরম ভৌগোলিক পার্থক্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব?

ইউরোপে কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু বেশ অসমভাবে ঘটেছে। যেখানে স্লোভাকিয়ায় যেমন প্রতি মিলিয়নে ৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বেলজিয়ামে প্রতি মিলিয়নে ৮৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশগুলো দক্ষিণ ফিনল্যান্ড থেকে উত্তর বলকান পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্য মহাদেশগুলোয়ও একই চিত্রের দেখা মিলেছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে কম মৃত্যুহারসম্পন্ন দেশগুলোর মাঝে সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে ক্রস ইমিউনিটি আছে কিনা। যেখানে সম্ভাবনা আছে অতীতে মৃদু সর্দিজ্বরজনিত করোনাভাইরাসের উপস্থিতিরও। এ ক’টি ইঙ্গিত হচ্ছে ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের অ্যান্টিবডিও হয়তো কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে। যদিও মৌসুমি করোনাভাইরাসগুলোর ওপর খুব অল্পই দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। তাই আমাদের জরুরি ভিত্তিতে আরো ল্যাব গবেষণা করা দরকার ক্রস ইমিউনিটি করোনাভাইরাসগুলো একে অন্যকে কতটা মূল্যায়ন করে তা বোঝার জন্য।

ডেরেক গাথেরার, লেকচারার, ল্যানকাস্টার ইউনিভার্সিটি

ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে স্বল্প বনাম দীর্ঘস্থায়ী সফলতা দেখতে কেমন?

কভিড-১৯ কে থামাতে হলে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন চিহ্নিত ও প্রস্তুত করা বেশ জরুরি। বছরের পর বছর ধরে ভ্যাকসিন বিকাশের প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। বৈশ্বিক অর্থায়নের নজিরবিহীন ও উল্লেখযোগ্য সংযুক্তির মাধ্যমে কেবল ট্রায়ালে ভ্যাকসিনের সফলতা বা ব্যর্থতার অনেকটুকু সময় কিনে নেয়া যেতে পারে। একটি সফল ট্রায়ালের জন্য ভাইরাসের কমিউনিটির মাঝে প্রচলিত থাকা দরকার। তাহলেই কেবল আমরা নির্ধারণ করতে পারব কতজন ভ্যাকসিনেটেড মানুষ সংক্রমিত হয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি সফলতা দেখায় যে সুরক্ষিত ভ্যাকসিন ৫০ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে। বড় প্রশ্ন হচ্ছে সুরক্ষা সময়কাল কত? যদি স্বল্পমেয়াদে হয় তবে আমরা কীভাবে ইমিউনিটিকে বুস্ট করতে পারি? আমরা প্রথাগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে কীভাবে এটি ঠিক করতে পারব? স্বল্পমেয়াদে ভবিষ্যতের সফলতার জন্য আমাদের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি।

অ্যানি মুর, সিনিয়ার লেকচারার বায়োকেমিস্ট্রি ও সেল বায়োলজি, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক

কীভাবে কভিড-সুরক্ষিত আচরণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে?

মনে হচ্ছে কভিড-১৯ আমাদের সঙ্গে ভবিষ্যতেও থেকে যাবে। এখন আমাদের সবার এমন কিছু আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া দরকার, যা আমাদের সংক্রমিত হওয়া থেকে এবং অন্যকে সংক্রমিত থেকে বাঁচাতে পারে। আমরা জানি সেগুলো কী। প্রশ্ন হচ্ছে সেগুলো কীভাবে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে?

কিছু আচরণ, যেমন ঘরের বাইরে গেলে অন্যদের কাছ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, কভিড কিট (ফেস মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও টিস্যু বহন করা), ইনডোর এরিয়ায়ও সঠিকভাবে মাস্ক পরা, সেটিকে ঠিকঠাক নষ্ট করা, সম্ভাব্য সংক্রমণ এড়াতে পৃষ্ঠতল এবং হাত জীবাণুমুক্ত করা, টিস্যুতে হাঁচি ও কাশি দেয়া, চোখে, মুখে ও নাকে হাত না দেয়া এবং ভ্যাকসিন গ্রহণ করে বাসায় অবস্থান নেয়া।

চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সময়ের সঙ্গে এসব বিষয় কতটা বড় পরিসরে মানিয়ে চলা হবে সেটি। আমাদের উচিত মানুষকে এমনভাবে তৈরি করা যেন এগুলো সময়ের সঙ্গে অভ্যাসে পরিণত হয়। সেজন্য সময় এবং সামাজিক ও পরিবেশগত সমর্থন প্রদানও জরুরি।

সুসান মিচিয়ে এবং রবার্ট ওয়েস্ট, হেলথ সাইকোলজির প্রফেসর, ইউসিএল

স্বাস্থ্যগত ফলাফল কেমন হবে?

আমাদের এখন কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়ে কত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে তার একটা হিসাব আছে। বেশির ভাগ মনোযোগ যেখানে মৃত্যুর ওপর নিবদ্ধ সেখানে ছোট ছোট কিছু গবেষণা হয়েছে হাসপাতাল থেকে যারা বাড়ি ফিরে গেছে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর। যেখানে দেখা গেছে, অনেকে দীর্ঘ সময় পরও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনি। এ দীর্ঘমেয়াদি কভিড সম্পর্কে আমরা কমই জানি, বিশেষ করে যাদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়েনি। এসব ক্ষেত্রেও আমাদের যথাযথ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ডেভিড হান্টার, প্রফেসর, এপিডেমিওলজি ও মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড