করোনার কারণে সারা পৃথিবীই এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে নিপতিত। রোগাক্রান্তি ও মৃত্যু দুইই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কোথাও কোনোটি একদিন কমেতো পরদিন তা আবার অন্যত্র বেড়ে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে কবে কোথায় যেয়ে তা থামবে, কেউই তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। যদিও কোনো কোনো সূত্র থেকে এ রকম প্রাক্কলন রয়েছে যে, জুন-জুলাই থেকে হয়তো তা কমতে শুরু করতে পারে। কিন্তু এর সবই অনুমান। বাস্তবে তেমনটিই ঘটবে কিনা (ঘটাটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা), তা আসলে জুন-জুলাই আসলেই কেবল বলা যাবে।
এদিকে করোনাজনিত পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীই-যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে এবং তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও-যে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, তাতে কারোরই বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই। তবে দেশ থেকে দেশে পার্থক্য হবে শুধু এটুকু যে, কেউ তা দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে পরিস্থিতিকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে পারবে। আবার এ কাজটিই যথাযথভাবে করতে না পারার কারণে কাউকে কাউকে হয়তো এ ক্ষেত্রে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনটি ঘটবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন পথ ধরে এগোবেন, তার উপর। তবে শেষের কথাটি শুরুতেই নির্বাহী সারসংক্ষেপের মতো করে বলি, ক্ষমতা বলয়ের চারপাশে সারাক্ষণ ছায়ার মতো অনুসরণ করতে থাকা স্বার্থান্বেষী মহলের বিষছায়া থেকে মুক্ত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত খুবই করুণ হয়ে উঠতে পারে।
পুনরুক্তি করে বলি, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সঙ্কটে পড়বে--এটি এখন খুবই সাধারণ আলোচনা। গণমাধ্যমে ও অন্যত্র এ নিয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে, যার অধিকাংশই অত্যন্ত গঠনমূলক এবং সে কারণে অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এখনই সুপরিকল্পিত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং যথেষ্ট প্রাক্কলনভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সে সঙ্কট-যে অত্যন্ত ভয়াবহও হয়ে ওঠতে পারে, সে বিষয়টি সম্ভবতঃ আমাদের অনেকের পক্ষে এখনো বুঝে ওঠা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তবে শেষ পর্যন্ত সে রকম একটি কঠিন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে কথা ভেবেই মানবতার এ কঠিন দুঃসময়ের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কতিপয় প্রস্তাব ও পর্যবেক্ষণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:
০১. প্রণোদনা তহবিল: ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে প্রণোদনা তহবিলে ভাগ বসাবার জন্য চতুর্দিক থেকে যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এবং সরকারও যেরূপ উদারভাবে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ ব্যতিরেকে যথাযথ অগ্রাধিকার নির্ধারণ ছাড়াই অর্থ বিলিয়ে যাচ্ছে, তাতে পরবর্তীতে এরচেয়েও অধিক জরুরি প্রয়োজনে তহবিল সংস্থানের ক্ষেত্রে সম্পদ স্বল্পতা দেখা দেয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। স্বীকার্য যে, সমস্যাটি খুবই আকস্মিক। ফলে সরকার হয়তো সমস্যার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে যেয়ে অত বাছবিচার করার সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে যেয়ে সিদ্ধান্ত প্রণেতাকে একাধারে দূরদর্শী, হিসেবী ও কঠোর হতে হবে। কাছের ও দলের মানুষকে অসন্তুষ্ট করে হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুস্পষ্ট অভিমত, প্রণোদনা তহবিলের বিলিবন্টনে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
লক্ষ্য করা গেছে যে, অনেক সামর্থবান বিত্তশালী শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীই করোনার সুযোগে প্রণোদনা তহবিলে ভাগ বসাবার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছেন। অথচ এ সমস্যা বা ধকল সামাল দেয়ার সামর্থ তাদের নিজেদেরই রয়েছে। তারা যদি এ লোভ সংবরণ করতে পারতেন, তাহলে জনগণের করের পয়সায় গড়ে ওঠা এ প্রণোদনা তহবিলের অর্থ দ্বারা বহুসংখ্যক দরিদ্র কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়গোষ্ঠীর ব্যাপক সংখ্যক মানুষ উপকৃত হতে পারতো। প্রণোদনা তহবিলের প্রতি বিত্তবানরা যদি এ লোভটুকু সংবরণ করতে পারেন, তাহলে সেটাই হতে পারে তাদের সর্বোত্তম সিএসআর (Social Corporate Responsibily) বা গরীবের মধ্যে খাদ্য বিতরণ। কিন্তু সারাজীবন ধরে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগকে অধিকার হিসেবে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত সুবিধাবাদী এ ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা (সবার কথা বলা হচ্ছে না) তা কি পারবেন?
০২. জ্বালানি তেলের মজুদ গড়ে তোলা: জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য এখন খুবই নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশের উচিৎ হবে এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে উক্ত তেলের একটি ভালো মজুদ গড়ে তোলা, যা পরে দুঃসময়ে খুবই কাজে দেবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা প্রথমেেই হয়তো মজুদ-সুবিধা না থাকার অজুহাত দেবেন। কিন্তু চেষ্টা করলে যথাযথ ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান অবস্থাতেই এ সুবিধা অন্ততঃ ২৫% বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করি। তাছাড়া, পুরো ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তেল দেশে এসে পৌঁছতে যে সময় লাগবে, ততক্ষণে তেলের ব্যবহারজনিত মজুদ-সুবিধা অনেকখানিই প্রস্তুত হয়ে যাবে মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন বলে আশা রাখি।
০৩. আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার: বিদেশে বাংলাদেশের বর্তমান শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখা ও করোনা-উত্তর সময়ে তা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এখন থেকেই উত্তঙ্গ (aggressive) যোগাযোগ ও দর কষাকষি শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করি। এ ক্ষেত্রে শ্রম মন্ত্রণালয়ের বর্তমান আধমরা ধরনের ঢিলেঢালা উদ্যোগ দিয়ে আর যাইহোক,চরম প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার দখল করা মোটেও সম্ভব নয়। করোনা-উত্তর কঠিন পরিস্থিতিতে তাতো আরো বেশি অসম্ভব। এ কাজের সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত করলে কিছুটা ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা যায়। আর বলা প্রয়োজন যে, বিদেশস্থ বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রম উইংসমূহে বর্তমানে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোকে ঢেলে সাজানোর কোনোই বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবশ্যই আরো সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতোমধ্যে তারাতো ভালোভাবেই জানেন যে, বিশ্বে এখন অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়ে বড় কোনো কূটনীতি নেই।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দোহাই দিয়ে গরীব মানুষ থেকে বাধ্যতামূলক কর নিয়ে আজ বহু বছর যাবৎ পোশাকখাতে কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। করোনা উপলক্ষে প্রণোদনার আওতায় একই ধরনের সুবিধা ভিন্ন নামে আরো এক দফা হয়তো বাড়বে। কিন্তু যারা তা নিচ্ছেন এবং যারা তা দিচ্ছেন এ উভয়েই জানেন, আমদানিকৃত কাপড় ও অন্যান্য উপকরণের মূল্য বাদ দিলে এ খাত থেকে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত পরিমাণ কত নগণ্য! আর সে তুলনায় জমি-ঘটিবাটি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের কাছ থেকে পাওয়া রেমিট্যান্সের পরিমাণর তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি! কিন্তু সেই রেমিট্যান্স আহরণকারীদেরকে আমরা কত টাকা নগদ ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিচ্ছি? অতএব বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে আমরা যেন সেভাবে দেখি।
০৪. বাজেট নিয়ন্ত্রণ: বেতনভাতা ব্যতীত রাজস্ব বাজেটের আওতাধীন অন্যান্য সমূদয় ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। অন্যদিকে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে অনুৎপাদনমূলক ও কম অগ্রাধিকার সম্পন্ন সকল প্রকল্প অবিলম্বে বাদ দেয়া হোক এবং অবশিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের আওতাধীন বেতনভাতা ব্যতীত রাজস্ব প্রকৃতির অন্যান্য সমূদয় ব্যয় কর্তন করা হোক। অন্যদিকে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপিতে করোনা সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত অন্য যেকোনো নতুন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্তি পুরোপুরিভাবে বন্ধ রাখা যেতে পারে। সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পাদিও আপাততঃ যতোটা সম্ভব নিয়ন্ত্রিত বা স্থগিত রাখা যেতে পারে।
০৫. বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বিতরণ না করা: করোনাজনিত পরিস্থিতিতে বিত্তবান ব্যক্তি এবং স্থানীয় ও বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বিতরণ না করে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য বলা যেতে পারে। তাতে একই পরিমাণ সম্পদ দিয়ে আরো বেশি সংখ্যক মানুষকে সেবা দেয়া সম্ভব হবে। এ জাতীয় সহায়তাকে সিএসআর হিসেবেও গণ্য করা যেতে পারে। গণমাধ্যমের সহায়তায় এ সংক্রান্ত বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করলে এ ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।
০৬. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ: রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আওতাধীন মাঠ পর্যায়ের সকল ত্রাণসামগ্রী ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে বিতরণ করাটাই শ্রেয়তর বলে মনে করি। সে ক্ষেত্রে বিতরণ-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। আর এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি এড়াবার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কমিটি গঠন করে বিষয়টি পরিধারণ করা যেতে পারে।
০৭. গ্রামাঞ্চলে নয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি: করোনাজনিত পরিস্থিতিতে গ্রামাঞ্চলে বাড়তি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেে সেখানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে জোরদার করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার যে, করোনার কারণে কাজ হারানো মানুষদের জন্য নয়া কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্ব-কর্মসংস্থানের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্বের সাথে বা তারচেয়েও অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
০৮. কর্মসূচির গ্রামমুখীকরণ: করোনা সহায়তা সংশ্লিষ্ট বর্তমানের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই হয়ে যাচ্ছে শহরকেন্দ্রিক। এগুলোকে আরো গ্রামমুখী করা প্রয়োজন। নইলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষই হয়তো রাষ্ট্রীয় সহায়তা কর্মসূচির বাইরে থেকে যাবে, যা আখেরে বড় ধরনের জনঅন্তোষের কারণ হয়ে ওঠতে পারে। তাছাড়া যুক্তি ও ন্যায্যতার বিচারেও তা গ্রামমুখী হওয়া প্রয়োজন।
করোনা আমাদেরকে সঙ্কট ও ঝুঁকিতে ফেলেছে, সন্দেহ নেই। আর সে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে কার্যকর ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিষ্কারের মতোই অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলার বিষয়টিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ উভয়ের মধ্যকার সমন্বয়, যে সমন্বয়ের অভাবে এই মুহূর্তে আমরা নিয়ত খাবি খাচ্ছি। কিন্তু সামনের দিনগুলোতে আমাদেরকে যেন একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করতে না হয়।
আবু তাহের খান
পরিচালক
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
atkhan56@gmail.com





