নভেল করোনাভাইরাসের আক্রমণে দুনিয়াজুড়েই মানুষ গৃহবন্দি জীবনযাপন করছে। বাঁচার অন্যতম উপায় বিচ্ছিন্ন থাকা। কিন্তু এ বাঁচতে গিয়ে মানুষ হারিয়েছে তার স্বাভাবিক জীবন। ঘুমের মাঝে সে জেগে উঠছে দুঃস্বপ্ন দেখে। কেন? তার ব্যাখ্যা খুঁজেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। তারা বলছেন সামাজিক দূরত্ব মানুষের সব প্রেরণাকে কেড়ে নিচ্ছে, তাই স্বপ্নে হানা দিচ্ছে দুঃস্বপ্ন।
ওয়াইল্ডার উপন্যাসের লেখক ল্যান্স ওয়েলার। মার্কিন এ লেখক সম্প্রতি অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি দেখেছেন মৃত প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান একটা কালো গাড়িতে করে তার পাশে এসে হাজির, গাড়ির কাচ নামিয়ে তিনি ওয়েলারকে গাড়িতে উঠতে বলেন। তারপর রিগ্যান ওয়েলারকে নিয়ে গেলেন একটা কমিক বইয়ের দোকানে। ওয়েলার দেখলেন সেখানে তার পছন্দের সব কমিক বই থরে থরে সাজানো। কিন্তু বই কেনার আগে হঠাৎই রিগ্যান ওয়েলারের মানিব্যাগ নিয়ে কেটে পড়লেন। হ্যাঁ, ওয়েলার স্বপ্নই দেখছিলেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সম্প্রতি দুনিয়ার নানা প্রান্তের মানুষ এমন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, যাকে সহজ ভাষায় বলা যায় নভেল করোনাভাইরাস প্যানডেমিক ড্রিমস।
বিজ্ঞান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে স্বপ্নের বিষয়বস্তু ও অনুভূতি আমাদের জেগে থাকা সময়ের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। ইঙ্গিতপূর্ণ অদ্ভুত স্বপ্নগুলো কাউকে কাউকে তাদের তীব্র স্মৃতি ও দৈনন্দিন মানসিক চাপ থেকে অবচেতনে মুক্তি দিয়ে থাকে। বিপরীতে দুঃস্বপ্ন হচ্ছে উদ্বিগ্নতার সতর্ক বার্তা, যা কিনা সম্ভবত আমরা আমাদের জেগে থাকা অবস্থায় অনুভব করতে পারি না।
নভেল করোনাভাইরাসের এ মহামারীকালে কোটি মানুষ গৃহবন্দি অবস্থায় আছে। অনেক স্বপ্নবিশারদ মনে করেন, নিজেদের পরিচিত পরিবেশে না থাকতে পারা এবং দৈনন্দিন উদ্দীপনা অনেককে একধরনের অনুপ্রেরণাহীন জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা কিনা আমাদের অবচেতন মনকে অতীতে ছাপ ফেলে যাওয়া স্মৃতি তুলে আনতে বাধ্য করছে। ওয়েলারের ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছে। কমিকসের প্রতি তার দীর্ঘদিনের ঘোর এবং টুইটারে ক্রমাগত রাজনৈতিক পোস্টে স্ক্রলিং করার যে প্রবণতা তার সম্মিলিত একটা সুরিয়াল দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা কিনা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক যে উদ্বিগ্নতা তারই একটা ভাষ্য।
গবেষকদের ন্যূনতম পাঁচটি দল একাধিক দেশে ওয়েলারের এ স্বপ্নের মতো আরো কিছু দৃষ্টান্ত সংগ্রহের কাজ করছে। তাদের পাওয়া ফলাফলগুলোর একটি হচ্ছে প্যানডেমিক ড্রিম মূলত দুশ্চিন্তা, আইসোলেশন ও ঘুমের ধরনের পরিবর্তন দ্বারা চিত্রিত।
বোস্টন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোলজির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও স্বপ্নবিশারদ প্যাট্রিক ম্যাকনামারা বলেন, আমরা সাধারণত র্যাপিড আই মুভমেন্টে (আরইএম) ঘুম ও স্বপ্ন দেখি যেন তীব্র ও নেতিবাচক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে নিশ্চিতভাবেই এ মহামারী অনেক উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি করছে।
ম্যাকনামারার মতে, স্বপ্ন দেখার কালে উদ্বেগ আমাদের মস্তিষ্ককে ভ্রমণে পাঠায়। নিউরোবায়োলজিক্যাল সংকেত ও প্রতিক্রিয়া যা স্বপ্ন তৈরি করেছে, তার সঙ্গে সাইকাডেলিক ড্রাগ দ্বারা সৃষ্ট অবস্থার সঙ্গে মিল রয়েছে। যার ফলে অপরিশোধিত আবেগী অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেটি হয় বিশেষ করে ঘুমের আরইএম অবস্থায় থাকার সময়। যখন মূলত আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি। এ প্রক্রিয়াটি রাতের বেলায় ঘটলেও অনেক মানুষ সচরাচর তাদের স্বপ্ন মনে রাখতে পারে না। করোনাকালের মহামারীতে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এর কারণ অতিরিক্ত আইসোলেশন এবং দুশ্চিন্তা, যা কিনা স্বপ্নের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত এবং স্বপ্নদর্শীকে সেসব মনে রাখতে প্ররোচিত করে।
একজনের উদ্বিগ্নতা ও অলসতা ঘুমের গুণগত মানকে নষ্ট করে। এছাড়া বারবার জেগে ওঠা, যাকে প্যারাসমনিয়াস বলে ডাকা হয়। তা স্বপ্নকে মনে রাখার সঙ্গে যুক্ত থাকে। আগের দিনের সুপ্ত আবেগ ও স্মৃতিও স্বপ্নের বিষয়বস্তু এবং সাড়া দেয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
লিওঁর নিউরোসায়েন্স রিচার্স সেন্টারের একটি গবেষণা বলছে, অনেকের মাঝে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, মার্চে ফ্রান্সে মহামারীর কারণে স্বপ্ন মনে রাখার প্রবণতা ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের দেয়া উত্তর বলছে, তাদের নেতিবাচক স্বপ্ন দেখার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
আরেকটি ভিন্ন গবেষণা বলছে, ইতালিতে এ সময় অনেকের দুঃস্বপ্নে ধরা দিচ্ছে পোস্টট্রমাটিক উদ্বেগ। ইউনিভার্সিটি অব রোমের সাইকোলজিক্যাল ফিজিওলজির প্রফেসর লুইগি ডি গেনারো বলেন, ২০০৯ সালে ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়াদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকে ঘুমের সমস্যা ও দুঃস্বপ্ন ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের নৈকট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে বর্তমান সময়ে যারা মহামারীর কাছাকাছি অবস্থান করছেন, তারাও করোনা সম্পর্কিত স্বপ্ন দেখছেন। তাদের মাঝে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী, মহামারীপ্রবণ অঞ্চলে বসবাসকারী এবং যাদের পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়েছেন তারা।
হার্ভার্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডেইরড্রে বারেট বলেন, ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর বেঁচে যাওয়ার স্বপ্ন গবেষণা করে দুই ধরনের স্বপ্ন পাওয়া গেছে। একটা হচ্ছে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত স্বপ্ন এবং অন্যটি ঘটনার হচ্ছে প্রতীকী অবস্থা। একইভাবে নভেল করোনাভাইরাসের সাম্প্রতিক নমুনা বলছে, কেবল স্বাস্থ্যকর্মীরা ছাড়া অন্য কেউ এ স্বপ্ন দেখছে না যে তারা শ্বাসকষ্টে ভুগছে বা ভেন্টিলেশনে আছে। যেহেতু ভাইরাসটি দেখা যায় না তাই স্বপ্নেও জম্বি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ছায়া শরীর বা দৈত্যসহ বিভিন্ন প্রতীকী রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





