মার্চের শুরুতে অ্যান্ড্রু নয়মেরের সন্দেহ দ্বিগুণ হলো! তিনি ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে কভিড-১-এ প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি অনুসরণ করছিলেন, তিনি জানতেন যে ডাটার মধ্যে সমস্যা থাকতে পারে। এমনকি সাধারণ শীতেও ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মৃত্যুকে নিউমোনিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। তিনি ভাবলেন, যদি এ রকম পরিচিত রোগ নিয়ে এমন কিছু হতে পারে, তবে কভিড-১৯-এ মৃত্যুর ঘটনা অজানা থেকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সে সময়ে নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে এ ডেমোগ্রাফার বলেন, আমার এখন মনে পড়ছে তখন আমি ভাবছিলাম, এটা মানুষকে বোঝানো সত্যিই কঠিন হবে।

এরপর মার্চ ও এপ্রিলে যখন জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসগুলো মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করতে থাকে, তখন তার সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হয়। মহামারীটি, যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ হত্যা করেছে।

কোনো একটি ধ্বংসাত্মক ঘটনার সময়—যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগের প্রাদুর্ভাব—গবেষকদের দ্রুত মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয় করা জরুরি। এটি সাধারণত ‘ব্লান্ট টুলস’ কিন্তু নির্ভরযোগ্য মেট্রিক: অতিরিক্ত মৃত্যু। প্রকৃত ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রত্যাশিত মৃত্যুর তুলনা অনেক বিজ্ঞানীর কাছে মহামারীর প্রভাব বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়ও বটে। এটি এপিডেমিওলজিস্টদের দেশগুলোর মাঝে তুলনা করতে সহায়তা করে, কারণ এতে দ্রুত গণনা করতে পারে। এটি কভিড-১৯-এর হটস্পট চিহ্নিত করতে পারে, অন্যথায় তা অচিহ্নিত রয়ে যেত। ৩০টির বেশি দেশ থেকে পাওয়া ডাটা বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে।

মহামারী শুরুর পর এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে দেশগুলোতে প্রত্যাশার চেয়ে ছয় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে বলে জানা গেছে।

তবে এ উচ্চস্তরের মেট্রিকে বেশকিছু ত্রুটি রয়েছে। কারণ যারা এ রোগে মারা যাচ্ছে এবং যারা মহামারী সম্পর্কিত অন্যান্য কারণে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পার্থক্য করতে পারে না। এটি নির্ভর করে মৃত্যুর সঠিকভাবে এবং সঠিক সময়মতো জানানোর ওপর। যা কিনা অনুন্নত মৃত্যু রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দমন করার কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া আরো বেশকিছু দিক রয়েছে, এ পরিসংখ্যানের রাজনৈতিকীকরণও হতে পারে। যা কিনা একটি দেশের অন্য দেশের ওপর সেরা দাবি করার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে অতিরিক্ত মৃত্যুর সাধারণ ঘটনাগুলো দেশগুলোকে মহামারী প্রতিক্রিয়ায় অপরিপক্ব বা ত্রুটিযুক্ত তুলনার দিকে পরিচালিত করেছে। কিন্তু  অনেকেই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ডাটার অভাব থাকার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে গেছেন।

এখানে আরো কিছু সংবেদনশীল উপায় রয়েছে, যার মাধ্যমে কভিড-১৯ কারণে কত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে এবং মহামারীর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ফ্যাক্টরে কেমন মানুষ মারা গেছে তা জানা যেতে পারে।

তথ্য নেয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত ডেমোগ্রাফার এবং জনস্বাস্থ্য গবেষকদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডেথ সার্টিফিকেট থাকবে। এরপর তারা এটা নির্ণয় করতে পারবে ভবিষ্যতের মহামারী প্রতিক্রিয়ার জন্য কোন ব্যবস্থাটি অধিকতর কার্যকর। অনেক মিডিয়া এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় ডাটা সংগ্রহ করে এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন।

ইউরোপে মৃত্যুর সংখ্যা যখন বেড়ে যাচ্ছিল তখন এপিডেমিওলজিস্ট লাসে ভেসটেগার্ড ছিলেন প্রথম ব্যক্তিদের একজন, যিনি এটি লক্ষ করেছিলেন। তিনি ইউরোপিয়ান মর্টালিটি মনিটরিং প্রজেক্টের (ইউরোমোমো) নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা কিনা ২৪টি ইউরোপীয় দেশ বা অঞ্চল থেকে সপ্তাহব্যাপী সব ধরনের মৃত্যুকে একত্র করে। মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে এ ইউরোমোমো ট্রেকার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যু দেখিয়েছিল, যা কিনা কভিড-১৯-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষিত মৃত্যুর চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। 

এখানে সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা রাডারের বাইরে রয়ে গিয়েছিল টেস্টিংয়ের স্বল্পতার কারণে এবং বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মৃত্যু গণনা করার কারণে। উদাহরণস্বরূপ কেয়ার হোমের মৃত্যুগুলো গণনার বাইরে রয়ে যায়। এতে করে দেশগুলো তথ্য নিয়ে কতটা প্রহসন সৃষ্টি করছে তার সম্পর্কে সত্যিকারের ধারণা পাওয়া একরকম অসম্ভব। ফলে গবেষক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ অতিরিক্ত মৃত্যু গণনার কাজ করেছেন। কারণ দ্বারা প্ররোচিত হওয়ার পরিবর্তে মেট্রিক কোনো নির্দিষ্ট সপ্তাহে কিংবা মাসে সক মৃত্যুকে তুলনা করে, মাহমারী না থাকলে কত মৃত্যু হতো তার সঙ্গে তুলনা করে। সাধারণত সর্বশেষ পাঁচ বছরের গড় করে। এটা বেশি সংবেদশীল হয় কীভাবে জনগণের মাঝে বয়স বাড়ছে কিংবা কীভাবে এটি অভিবাসন বা দেশত্যাগের ফলে পরিবর্তিত হচ্ছে তার উল্লেখের মাধ্যমে। যদিও এ সংযোজনগুলো দেশগুলোর মাঝে তুলনাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

অনেক ডেমোগ্রাফারের মতে, অতিরিক্ত মৃত্যুর এ ব্লান্ট টুলস মহামারীর সময় ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহামারীতে মৃত্যুর কারণ জানতে আরো সূক্ষ্ম ডাটা ব্যবহার করতে তারা সক্ষম হবে। তারা মৃত্যুকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেখতে পারে: সরাসরি মৃত্যু, যার জন্য কভিড-১৯ কারণ; সরাসরি কিন্তু গণনার বাইরে মৃত্যু, যেখানে ভাইরাস দায়ী কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লিখিত না এবং পরোক্ষ মৃত্যু, যেখানে মহামারীর কারণে তৈরি হওয়া অন্য কোনো পরিস্থিতিতে মৃত্যু।

বর্তমানে অতিরিক্ত মৃত্যুর পরিসংখ্যানই সাহায্য করছে বিভিন্ন জায়গায় প্রাদুর্ভাবের পথটি চার্ট করার জন্য। ভবিষ্যতে মৃত্যুর সম্পূর্ণ কারণসহ ডাটা দিয়ে গবেষকরা দেশ থেকে দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে লকডাউন ও অন্যান্য হস্তক্ষেপের প্রভাবগুলো বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন। নয়মারের মতে, সেটা এখন করা ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে মহামারী এখনো অপ্রতিরোধ্য এবং চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যাও অজানা। তিনি বলেন, আমাদের কাছে এখনো খুব বেশি বিকল্প নেই। মহামারীর আক্রমণে আমরা এখনো ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যার ভেতর আছি। এটা অনেকটা হারিকেন চলার মধ্যবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত নির্ণয় করার মতো ব্যাপার হবে।

নেচার অবলম্বনে