বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো যেখানে হেড টু ডেড লড়াই করছে, সেখানে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কোম্পানির ভ্যাকসিন পেতে সরকারগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। স্মরণকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস থেকে বাঁচতে ধনী দেশগুলো সব পদ্ধতিই প্রয়োগ করবে। এক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের সরকারগুলো যদি বৈশ্বিক কৌশলের সঙ্গে একমত হতে না পারে তবে ভারতের উৎপাদন শক্তি নিয়ে আশা করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসাস সতর্ক করেছেন মহামারী মোকাবেলায় জাতীয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি সাহায্য করবে না এবং মহামারী থেকে বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে দেবে। তবুও এরই মধ্যে ভ্যাকসিন সন্ধানে জাতীয়তাবাদ প্রকট আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় কমিশনসহ আরো কয়েকটি দেশ সর্বাধিক প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থীর ভ্যাকসিন পেতে নির্মাতাদের সঙ্গে বিভিন্ন অগ্রিম ক্রয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এ জাতীয় চুক্তির জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করেছে।
একটি সফল কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের বিশ্বব্যাপী আদর্শ বিতরণটি হলো স্বাস্থ্যকর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়া, তারপর বড় আকারের প্রকোপযুক্ত দেশগুলো এবং তারপর বিশেষত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এমন লোকদের। আর ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ কাটিয়ে উঠতে ভারত মুখ্য ভূমিকা নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ দেশটি গ্লোবাল সাউথে ওষুধের প্রধান সরবরাহকারী। আন্তর্জাতিক মানবিক চিকিৎসা সরবরাহকারী বেসরকারি সংস্থা মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ারেস একবার দেশটিকে ‘বিশ্বের ফার্মাসি’
হিসেবে অভিহিত করেছিল। ভারতের এখনো ভ্যাকসিন উৎপাদনের বৃহৎ ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিন উৎপাদনে ভারতের ভূমিকা দুটি ভিন্ন উপায়ে আসতে পারে—একটি অন্য কোথাও তৈরি ভ্যাকসিনের গণউৎপাদন (সম্ভাব্য) বা একটি নতুন ভ্যাকসিন তৈরির পাশাপাশি এটির উৎপাদন (কম সম্ভাব্য, যদিও অসম্ভব নয়)।
ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো শেষ হওয়ার আগেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিনের উৎপাদন শুরু করেছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনেতে অবস্থিত সিরাম ইনস্টিটিউট বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক এবং ২০২০ সালের মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডোজ সরবরাহ করার চুক্তি করেছে। সংস্থাটি আমেরিকান ফার্ম নোভাভ্যাক্সের ভ্যাকসিনেরও উৎপাদন ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য চুক্তি করেছে। আরেকটি ভারতীয় ফার্মা সংস্থা বায়োলজিক্যাল ই (বিই) জনসন অ্যান্ড জনসনের ভ্যাকসিন প্রস্তুত করতে সম্মত হয়েছে। হায়দরাবাদভিত্তিক সংস্থাটি উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী আরেক সংস্থা অ্যাকর্ন ইন্ডিয়াকে অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে।
গণউৎপাদনে ভারতের সাফল্য সত্ত্বেও নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে কাজ করছে। সেরাম ইনস্টিটিউট, অরবিন্দ ফার্মা, ভারত বায়োটেক, বিই, ইন্ডিয়ান ইমিউনোলজিকস, মাইনভ্যাক্স, প্যানাসিয়া বায়োটেক ও জাইডাস ক্যাডিলা সবাই তাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছে।
এখন প্রশ্ন হলো ভারতের উৎপাদিত ভ্যাকসিন কে পাবে? বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং খুব মিশ্র বার্তা এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন সম্পর্কে সিরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আদার পুনাওয়ালা বলেছেন, বেশির ভাগ ভ্যাকসিন বিদেশে যাওয়ার আগে আমাদের দেশবাসীর কাছে যেতে হবে। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে যে অন্য দেশ কতটা পাবে এবং কখন পাবে।
আরেকটি সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, আমি যেগুলো উৎপাদন করব তার ৫০ শতাংশ পাবে ভারত এবং বাকি অর্ধেক বিশ্বের অন্যান্য অংশে। এ ধারণাটি সম্পর্কে ভারত সরকারও আপত্তি করেনি।
ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র প্রভাষক ররি হর্নার বলেন, ভ্যাকসিন কূটনীতি কার্যকর হতে পারে, যেমনটি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফরে গিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ভারত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। শ্রিংলা যোগ করেছিলেন, ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী, বন্ধুদেশ, অংশীদার এবং অন্যান্য দেশ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাবে। ভারত তার বিশাল উৎপাদনক্ষমতার জন্য নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল বিশ্বের ফার্মাসি হিসেবে তার ভূমিকা অব্যাহত রেখে ভ্যাকসিন রফতানি করবে।
দ্য প্রিন্ট





