কভিড-১৯ মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনটির নাম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই সংগঠনটিকে নিয়ে অনেকের মাঝে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে এর নেতৃত্ব কি আসলেই মহামারীর চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে সক্ষম?
সম্প্রতি জেনেভার এক সংবাদ সম্মেলনে টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইয়েসুস বেশ আন্তরিক ও শান্ত ছিলেন। যেখানে তিনি তার মানবিক মিশনের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, একে অন্যের ওপর আঙুল তুলে আমাদের সময় নষ্ট করা উচিত না। এরপর তার আচরণ হঠাৎ করেই বদলে গেল এবং তিনি যা বলেছেন নিজেই ভুলে গেলেন।
টেড্রোস, যার সম্পর্কে বলা হয় যে তিনি একাই অনেক কিছু সামলাতে পারেন, জীবননাশের হুমকি পাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি এসব পরোয়া করি না। কিন্তু যখন বিষয়টি বর্ণবিদ্বেষে এসে দাঁড়ায় তখন তিনি মোটেই চুপ করে থাকেন না। এছাড়া তার বিপক্ষে আরো নেতিবাচক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং তিনি জানেন এর পেছনে কারা আছেন। তাইওয়ানের নাম উল্লেখ করে এ নিয়ে তিনি ক্রোধও প্রকাশ করেছিলেন।
অবশ্য কূটনৈতিকদের এমন ক্রোধ প্রকাশের বিষয়টি বেশ বিরল। কারণ তিনি সেই অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে পারেননি। কিন্তু এর ফলে এটা বোঝা যায় যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কতটা চাপে আছেন।
সংস্থাটির অন্যতম একটি স্লোগান হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায়
আমরা রাজনীতি করি না। এই সংস্থাটি কাজ করে অনেকটা জাতিসংঘের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো করে। যেখানে সব মিলিয়ে কর্মীর সংখ্যা ৭ হাজার। কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে এ বিরোধ বলছে, তাদের সামনে এখন যে পরিস্থিতি তা আগের চেয়ে অনেক কঠিন।
কীভাবে মহামারী পরিস্থিতি ও তাইওয়ান ইস্যু সংযুক্ত তা বুঝতে হলে অতীতে ফিরে যেতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আবির্ভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। এর লক্ষ্যই ছিল বিশ্বের সব দেশে স্বাস্থ্যকর জীবন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সব আদর্শিক বাধা অতিক্রম করে মেডিকেল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা এবং সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করাও তাদের কাজ। এর অন্যতম সাফল্য সম্ভবত গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে। স্নায়ুযুদ্ধের মাঝে এটি ছিল একটি উজ্জ্বল মুহূর্ত।
যখনই কোনো মহামারী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে মোড় নেয়, তখনই এর নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের ভার নেয় সংস্থাটি। এটি সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা, জিকার মতো রোগের সামাল দিয়েছে। আর এখন কভিড-১৯-এর মাঝামাঝি অবস্থায় আছে। যা কিনা এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ।
সহজ শিকার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্নতর। ট্রাম্প সংগঠনটিকে অনেকটা হিংস্রভাবে নিজের শক্তির অধীনে টেনে আনতে পেরেছেন। যা প্রমাণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খুবই সহজ লক্ষ্য এবং দুর্বলও। এর মাঝে সংস্থাটির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ভিতের জায়গা থেকেও সরে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়ে জানান তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় নিজেদের অর্থায়ন বন্ধ করছে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংস্থাটি কী ভুল করেছে, তাও খতিয়ে দেখবে তারা। ট্রাম্প নিজের রায়ও শুনিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ সময় সংস্থাটির বিপক্ষে চীনের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগও আনেন তিনি।
ট্রাম্পের যুক্তির পক্ষে ট্রাম্প জানুয়ারিতে টেড্রোসের বেইজিং সফরের বিষয়টি আসতে পারে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানকে চীনের সর্বোচ্চ নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায়। তখন তিনি বলেছিলেন, চীন প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় মানদণ্ড স্থাপন করছে। এ সময় ভাইরাস নিয়ে চীন সরকারের আরোপ করা নানা সেন্সরশিপ নিয়েও টেড্রোস কোনো সমালোচনা করেননি।
এমনকি উচ্চমাত্রার সংক্রামক কভিড-১৯ তাইওয়ানে দেখা যাওয়ার পরও শান্ত থাকার কথা বলেছিল সংস্থাটি। তারা বার্তা দিয়ে জানায়, প্রারম্ভিকভাবে চীনা কর্তৃপক্ষের তদন্তে নভেল করোনাভাইরাসের একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি।
এটা দেখায় যে ট্রাম্প নিজের ভুল থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আক্রমণ করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট পুরোপুরিভাবে ভুলও নন। অস্ট্রেলিয়া তাত্ক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে এর নিবিড় তদন্ত দাবি করেছে। জাপানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নাম বদলে চীনা স্বাস্থ্য সংস্থা রাখতে।
টেড্রোস অবশ্য নিজের মতো করেই লড়াই করতে চাইছেন। তিনি কিছু এক ওয়ার্ডের ম্যাসেজ দিয়েছেন টুইটারে—সংহতি, মানবতা, ঐক্য, ভালোবাসা।
পরিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় টেড্রোসের ঘনিষ্ঠ এক সহকর্মী বের্নহার্ড শোয়ার্টল্যান্ডার বলেছেন, তার বস নিজের আদর্শ ও মূলনীতিতে অনমনীয় ও দৃঢ়চেতা। তিনি আরো বলেন, টেড্রোস যেকোনো ধরনের চুক্তি করতে রাজি নন। তার স্বাধীনতাই তাকে পূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে টিকে থাকতে তাকে সক্ষম করে তুলেছে।
টেড্রোসের মতো শোয়ার্টল্যান্ডারও এ সময় চীনের বেশ প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শুরুর দিকে জেনেভা খুব অস্বস্তিতে ছিল। সংখ্যা ও চিত্র দেখে তাদের মনে হচ্ছিল এখানে চেরনোবিলের মতো কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু কঠোর লকডাউন নীতি এবং দ্রুতগতিতে হাসপাতাল বানিয়ে চীন ভয়াবহ মেডিকেল ধস সামাল দিতে সক্ষম হয়।
এদিকে আফ্রিকা থেকে প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন টেড্রোস। ইথিওপিয়ার ৫৫ বছর বয়সী এই বায়োলজিস্ট ও ইমিউনোলজিস্ট দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন। এ সময়ে আফ্রিকার দেশগুলো, বিশেষ করে ইথিওপিয়ার সঙ্গে চীন সম্পর্ক তৈরি করে লোন ও অবকাঠামোগত সাহায্য প্রদান করে। এ সময় টেড্রোসের সঙ্গে চীনের বোঝাপড়াও বেশ ভালো হয়। তবে টেড্রোস যখন সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিল তখন ইথিওপিয়ায় মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা ও মানব অধিকার ছিল না। যা কিনা তাকেও কিছুটা অসংবেদনশীল করে তুলেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরো বেশকিছু অভিযোগও শুরু থেকে ছিল। যেখানে একজন স্বৈরাচারকে সংস্থার পোস্টার বয় করার মতো ঘটনাও ছিল। পাশাপাশি আফ্রিকান অঞ্চলে যেখান থেকে টেড্রোস এসেছেন, সেখানকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাও বেশ কঠিন সংস্থার জন্য।
নতুন ধরনের সংস্থা
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সময়ে এসে চীনা ধনকুবের জ্যাক মার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। যেখানে আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতার সাম্প্রতিক অনুদানের মধ্যে রয়েছে ১০০ মিলিয়ন উচ্চমানসম্পন্ন সার্জিক্যাল মাস্ক। এছাড়া প্রাইভেট অনেক সংস্থাকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছে তারা। কিন্তু তার পরও এর বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি হাসপাতালের মতোই।
চীন কি শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবে?
যদি যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে তবে অর্থনৈতিক ঘাটতি মেটানো সংস্থাটির জন্য কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে চীন হয়তো তাদের অনুদানের অর্থ বৃদ্ধি করতে পারে। এরই মধ্যে দুটি বিশেষ অনুদানের ঘোষণাও এসেছে চীনের পক্ষ থেকে। তবে জেনেভার কর্তাব্যক্তিরা যতই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখতে চান না কেন, অর্থ সবসময় রাজনৈতিক। কিন্তু তাইওয়ান যারা কিনা এখন পর্যন্ত ভালোভাবে কভিড-১৯ মোকাবেলা করেছে, তাদের পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন সহজ হবে না যদি চীনের প্রভাব বাড়তে থাকে। এদিকে এমন কঠিন মহামারীর সময়েও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্ক বেশ সীমিত ছিল বলে জানা গেছে। তবে একমাত্র সদস্য দেশগুলোই পারে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে। যদিও তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আর এমন বৈষম্যমূলক পথে মহামারী মোকাবেলা করাও বেশ কঠিন।
স্পিয়েগেল ইন্টারন্যাশনাল





