এলিজার পুরুবোরা ছিলেন পুরুবোরা ভাষায় কথা বলতে পারা শেষ ব্যক্তিদের একজন। এ বছরের শুরুতে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। ৯২ বছর বয়সী ব্যক্তিটির এ মৃত্যু তার ভাষার ভঙ্গুর অবস্থানকে বিলুপ্তির খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মূলত ইউরোপীয়দের আগমনের পর থেকে ব্রাজিলের আদিবাসীদের ভাষা হুমকির মুখে আছে। একটা সময় যে ১ হাজার ৫০০টি ভাষায় কথা বলা হতো তার মাত্র ১৮১টিই এখন কেবল প্রচলিত আছে। বেশির ভাগ ভাষার ক্ষেত্রে কথা বলার জন্য রয়েছে এক হাজারেরও কম অধিবাসী। কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী বিশেষ করে যাদের জনসংখ্যা বড় (যেমন গুয়ারানি এমবায়া), তারা
নিজেদের মাতৃভাষাকে ধরে রাখতে পেরেছে। কিন্তু ছোট গোষ্ঠীগুলোর ভাষার অবস্থা ভিন্ন। যেমন পুরুবোরা ভাষায় এখন কেবল ২০০ জন লোক কথা বলে। এ ভাষা কি তবে এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে?
চলমান মহামারী পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলেছে। ব্রাজিলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৩৯ হাজারের অধিক সংক্রমণের বিষয়টি এরই মধ্যে সামনে এসেছে। যেখানে পুরুবোরা ভাষায় কথা বলা ছয়জন ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত। আক্রান্তের মধ্যে ৮৭৭ জন মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানা গেছে।
কভিড-১৯ বিশেষত কেড়ে নিচ্ছে এলিজারের মতো বয়স্কদের জীবন, যারা কিনা ভাষার রক্ষক হিসেবে পরিচিত। করোনাভাইরাস সম্প্রদায়গুলোকে বাধ্য করেছে আইসোলেশনে থাকতে। ফলে নিয়মিত যেসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো (যা কিনা ভাষা জীবন্ত রাখার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে) সেই অনুষ্ঠানগুলো আর হতে পারছে না।
পুরুবোরাদের জন্য তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা। একশ বছরের বেশি সময় আগে ইন্ডিয়ান প্রটেকশন সার্ভিসের অধীনে কাজ করা রাবার টেপাররা রোনডোনিয়ার অ্যামাজোনিয়ান স্টেটে পৌঁছেছিল। তারা আদিবাসী পুরুষ, কিশোরদের রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করে। যেখানে একমাত্র পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলার অনুমতি ছিল।
মা এমিলিয়ার মৃত্যুর পর পুরুবোরাদের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব পান হোজানা পুরুবোরা। তিনি বলেন, আমাদের সংস্কৃতির আলোকে যেকোনো কিছু করা নিষিদ্ধ ছিল। এমিলিয়া ছিলেন এলিজারের
ছোটবেলার বন্ধু ও আত্মীয়। শৈশবে যখন আশেপাশ কেউ থাকত না তখন তারা পুরুবোরা ভাষায় একে অন্যের কানে কথা বলতেন। হোজানার মতে, গোপনে তারা (এমিলিয়া ও এলিজার) নিজেদের ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ান প্রটেকশন সার্ভিস ঘোষণা দেয় সেখানে আর কোনো আদিবাসী মানুষ নেই। কারণ তারা মিশ্রিত ও সভ্য হয়ে উঠেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পুরুবোরারা হারিয়ে গেল।
আর্কাইভ তৈরি
কিন্তু পুরুবোরারা হারিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এপেরোই নামে শেষ পুরুবোরা গ্রামটি তৈরি করে। তারা সয়া ও গবাদি পশুর খামারিদের কাছ থেকে ৬২ একর পৈতৃক জমি কিনে নেয়। এটা তাদের লোকজনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে এলিজার তার মেয়েকে নিয়ে নিকটবর্তী শহর গুজারা মিরিমে বাস করতে শুরু করেন। পুরুবোরারা এমিলিও গোয়েলদি প্যারায়েন্স জাদুঘরের একজন ভাষাবিদ আনা ভিকলাসি গালুসিওর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। গালুসিওর বাড়ি ছিল ব্রাজিলিয়ান আমাজনের ৮০টি আদিবাসী ভাষার স্থায়ী আর্কাইভ। পুরুবোরাদের সাহায্য নিয়ে তিনি তাদের ভাষা নিয়েও আর্কাইভ তৈরির উদ্যোগ নেন।
গালুসিও যখন ২০০১ সালে পুরুবোরোদের গ্রামে যাওয়া শুরু করেছিলেন তখন নয়জন পুরুবোরা বয়স্ক সদস্য বেঁচে ছিলেন, সে তালিকায় এলিজার ও এমিলিয়াও ছিলেন। যারা আবার নিজেদের ভাষাকে টিকিয়ে রাখার কাজ করছিলেন। অনেকেই গ্রাম থেকে দূরে থাকত এবং কয়েক দশক ধরে পুরুবোরাতে কথা বলেনি।
গালুসিও বলেন, ব্যাপারটা এমন না যে তারা কেবল কথা বলেননি, তারা এটা শোনেননি। তাদের ভাষার সঙ্গে নিজেদের কোনো যোগাযোগই ছিল না। কথা বলার জন্য গালুসিও তাদের একত্র করলেন। তারা হেডফোন পরে মাইক্রোফোনে কথা বলেন। তারা যা-ই বলেছেন, তা তাদের ভাষার অডিও আর্কাইভে রেকর্ড হয়ে যায়। প্রথম দিকে তারা মুষ্টিমেয় শব্দ মনে করতে পেরেছিল। প্রাণীদের নাম সহজেই মনে আসে, কিন্তু ব্যাকরণ ও বাক্যগঠন করা ছিল কষ্টের। কিন্তু তারা যত বেশি সময় কথা বলতে পেরেছেন, তত বেশি তারা মনে করতে শুরু করেন।
এখন মোটামুটি স্বতঃস্ফূর্ততায় কথা বলতে পারেন এমন দুজন ব্যক্তি বেঁচে আছেন। পাওলো অ্যাপোরেটে ফিলো এবং নিলো পুরুবোরা। তাদের বয়স এখন ৯০-এর কোটায় এবং স্বাস্থ্যও বেশ দুর্বল। দুজনই আবার করোনাভাইরাসের জন্য অধিকতর সংবেদনশীল। এমনকি তারা এপোরোইওতেও থাকেন না এবং মহামারীর কারণে কেউ তাদের দেখতেও আসেন না। হোজানার আশঙ্কা হচ্ছে, তারা যা জানেন তা ভাগাভাগি করার আগেই কভিড-১৯ তাদের জীবন কেড়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, আর্কাইভে এখনো অনেক কিছুই নেই। আমরা অনেক দুশ্চিন্তায় আছি, কারণ বলার মতো অনেক কিছু তাদের কাছে আছে।
অপ্রত্যাশিত অনুপ্রেরণা
গুয়ারানি এমবায়াদের ওপরও মহামারী ব্যাপকভাবে আঘাত হেনেছে। সাও পাওলোতে তাদের সম্প্রদায়ের তৈরি করা ছয়টি গ্রামের শতাধিক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছে। যেখানে শত বছর বয়সী মানুষও আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউই মারা যায়নি। সম্প্রদায়টির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুরো যারা গুয়ারানি ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়ে থাকে, সেগুলোও বন্ধ। ফলে শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ভাগাভাগিগুলো থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। অনেক মানুষ এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছে। কিন্তু এরপর গুয়ারানি ভাষা একটি অপ্রত্যাশিত অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। যখন মহামারীটি আঘাত করে তখন অ্যান্থোনি কারাই নামে এক তরুণ আদিবাসী নেতা অনলাইনের ভাষা শিক্ষার ক্লাস চালু করেন। এটি মূলত সম্প্রদায়ের বেকারদের আয়ের একটি উপায় ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ১০০ জন শিক্ষার্থীকে সামলাতে পারবেন। কিন্তু দেখা গেল দুই ঘণ্টার মাঝে ৩০০ জন সেখানে নাম লিখিয়েছে।
কারাই কাউকে ফেরাতে চাননি। ফলে তিনি ভিন্ন গ্রাম থেকে আরো দুজন শিক্ষককে ডাকলেন অতিরিক্ত ২০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য। গুয়ারানি শেখানো তাকে কেবল ভাষাকে জীবন্ত রাখতে সহায়তা করেনি, বরং আদিবাসীদের বাইরেও ভাষাটিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কারাই বলেন, আপনি যখন ভাষা শিখবেন, তখন কেবল ভাষা শিখলেই হবে না। আপনাকে সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে হবে। বিপরীতটাও সমান সত্যি। ভাষা হারানো মানে সংস্কৃতিকেও হারানো এবং সেটিই এখন পুরুবোরা ভাষার শিক্ষক মারিও পুরুবোরার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
এপেরোইতেও গুয়ারানি এমবায়ার গ্রামের মতো শিশুরা স্কুলে পুরুবোরা শিখে থাকে। কিন্তু মহামারীর আগেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল স্কুল বন্ধ করে দিতে, কারণ সেখানে মুষ্টিমেয় শিক্ষার্থী ছিল। এমনকি ক্লাস চালু রাখার জন্য লড়াই করা মারিও নিজেও পুরুবোরাতে স্বচ্ছন্দ না।
দ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক





