আশ্রমের চিন্তা ও ধ্যানমগ্ন কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় করোনাভাইরাসের এই মহামারীর সময়ে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিতে পারে। সন্ন্যাসীদের মতো আমরাও আধ্যাত্মিকভাবে এ পরিস্থিতির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না বা এ রকমটা আমাদের চাওয়ার মধ্যেও ছিল না। আমরা এখন নিজেদের ঘরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছি। এটা হচ্ছে মৃত্যুর ছায়া, যা আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে মৃত্যু ও দুর্বলতা সম্পর্কে।
গত ক্রিসমাসে আমি মুন্ডগোডে বৌদ্ধ নারীদের একটি মঠে (ন্যানোরি) বৈঠক করছিলাম বিজ্ঞানীদের সঙ্গে, যারা নতুন বিজ্ঞান শিক্ষায় যুক্ত হতে এবং সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহী ছিলেন। বিস্তৃতভাবে আধুনিক বিজ্ঞানকে বোঝা তাদের সন্ন্যাস প্রশিক্ষণের অংশ ছিল।
ন্যানোরিতে জীবনের একটি শান্তিময় সুর রয়েছে। সন্ন্যাসিনীরা ভোরের আগেই উঠে পড়েন এবং জীবন শক্তিতে উদ্দীপ্ত হয়ে নিজেদের দৈনন্দিন কাজগুলো শুরু করেন। তাদের দিনগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা খুব কম, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবন হয় শৃঙ্খলাপূর্ণ, এতে নতুন কিছুকে জায়গা দেয়াটা কঠিন।
লাদাখ থেকে আগত এক সন্ন্যাসিনী আমাকে বলেছিলেন যে সন্ন্যাস জীবন বেছে নেয়ার তার সিদ্ধান্ত উৎসাহিত হয়েছিল উদ্দেশ্যমূলক জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। তিনি বলেন, আমাদের সামাজিক আইসোলেশন দরকার একজন আরেকজনের জন্য জায়গা তৈরি করার জন্য। বেষ্টনী আমাদে বুঝিয়ে দেয় আমরা একে অন্যের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
বাইরের দুনিয়া থেকে পৃথক এই জীবন, যেখানে সামাজিক যোগাযোগ কেবল পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে কাজ করা, ডাক্তার দেখানো কিংবা নির্দিষ্ট জিনিসের কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ। এটা বেশ কঠিন বলে মনে হয়। কিন্তু আরো কঠিন হচ্ছে লম্বা একটা সময় নিজের মুখোমুখি হওয়ার জন্য গভীর নীরবতার সামনে দাঁড়ানো।
কিন্তু মহামারীর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর জীবন আমাদের এমন পরিস্থিতিতেই ছুড়ে ফেলেছে। অনেকটা জোরপূর্বক এই কোয়ারেন্টিন আমাদের মুখোমুখি করেছে নিজেদের সম্পর্কে কঠিন সব সত্যের। পাশাপাশি এটা স্বীকার করতে হবে যে অনেকে উদ্বেগের মধ্যে থাকার পরও এ বিষয়টি থেকে পালিয়ে থাকা কঠিন। একভাবে বললে, বৌদ্ধ নারীদের আশ্রমের অভিজ্ঞতা আমাকে তৈরি করেছে স্তব্ধতার এই সময়ের জন্য। সেখানে কাটানো পাঁচদিনের অভিজ্ঞতার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই সন্ন্যাসী জীবনের প্রাকৃতিক ছন্দকে আলিঙ্গন করার।
আমি জেগে উঠতাম ভোরের আগে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি এবং ধর্মগ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে। আশ্রমের এই স্তব্ধতা আমার ওপর গভীর প্রভাব ফেলত। ফলে এই ধ্যানমগ্ন অবস্থার প্রভাব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত আমার মনে থেকে যেত। যেমনটা বলা হয় যে সকাল দিনের আভাস দেয়, আমি সন্ন্যাসিনীদের সঙ্গে তাদের দিনযাপনের সঙ্গী হয়ে থাকতাম। তাদের কেউ কেউ গোটা ন্যানোরির জন্য রান্নাঘরে চা বানানো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। অন্যদের কেউ কেউ আশপাশে নির্মাণ ও কৃষিকাজে সহায়তা করত। বড় একটি অংশ মঠের পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করত কিংবা প্রশাসনিক কাজে সাহায্য করত। কাজকর্মের এই ছন্দে আমি বাইরের জগতের ঝামেলার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম।
সকালের এই ধীর গতি তৈরি করে সারা দিনের ক্লাস, পড়া, প্রার্থনা, বিতর্ক এবং সম্প্রদায়ের কাজ করার পথ। এসব কিছুই ঘটে একটি আশ্রমের দেয়ালের ভেতরে।
সেই ন্যানোরিতে কাটানো ‘কোয়ারেন্টিন’
জীবন আমাকে এটা অনুধাবন করতে সাহায্য করেছিল যে ধ্যানমূলক পশ্চাদপসরণের ধারণা থেকে এটা কত ভিন্নতর। এটা আমাকে নির্জনতার ভয় কাটিয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। সত্যি কথা বলতে, আমি নিজেকে অনেক বেশি বিবেকবান বলেও অনুভব করলাম।
আমি একজন সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে কথা বললাম, যিনি ২০ বছর আগে এমন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বৌদ্ধিক অনুশীলনের মননশীলতা ও সচেতনতা দ্বারা। যা তাকে পার্থিব ছক ভাঙতে সহায়তা করেছিল।
তিনি আমাকে বলেন, আপনি যখন দৈনন্দিন দায়িত্ব ও কোলাহল দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন তখন আত্মোপলব্ধির জন্য সময় বের করা খুব কঠিন। সন্ন্যাসীর অভ্যাস সুযোগ তৈরি করে দেয় পড়া এবং ভাবনার, যেহেতু সবকিছু থেকে আপনি তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন।
তিনি বলেছিলেন ন্যানোরিতে প্রবেশের সে সময়টা ছিল নতুন করে শুরুর একটি মুহূর্ত। আইসোলেশন কোনো নির্জন কাজ নয়, কিন্তু এটি একটি আনন্দময় অবস্থা। তার কাছ থেকে সূত্র নিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ঘুরে দাঁড়াব এবং আরো চিন্তামগ্নতা নিয়ে জীবন শুরু করব। আমিও নতুনভাবে জীবনকে দেখতে শুরু করলাম।
আউটলুক থেকে অনূদিত





