ক্লাস, পরীক্ষা, বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিকভাবেই। একদিন বিদ্যালয় থেকে এসে রাতে জানা গেল কভিড-১৯ মহামারীর বিস্তার ঠেকাতে পরদিন থেকে বিদ্যালয় বন্ধ। এ খবর শোনার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনযাপন ছিল—সকালে উঠে ক্লাসের পড়শোনার প্রস্তুতি, বিদ্যালয়ে যাওয়া, মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে টিফিন ভাগাভাগি, বিদ্যালয় থেকে ফিরে খেলাধুলা, রাতে পড়াশোনা ইত্যাদি। কিন্তু হঠাৎ করেই সব যেন পরিবর্তন হয়ে গেছে। এ ধরনের নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে না প্রত্যাশিত, না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া যায়।
এরই মধ্যে শিক্ষক, অভিভাবক থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও সিলেবাস নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পড়াশোনাটা এগিয়ে নিতে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনলাইনে বা টেলিভিশনে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। আবার বাবা-মাও চেষ্টা করছেন বাড়িতে বসে বাচ্চাদের পড়াশোনাটা এগিয়ে নেয়ার। তবে এক্ষেত্রে খুব তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে, যা শিশুদের মানসিক চাপে ফেলতে পারে বলে বলছেন ভারতের নয়াদিল্লির একজন শিক্ষক ও লেখক সৌমি দাস।
তিনি বলেন, জুম, গুগল ক্লাসরুম বা অন্য অনলাইন প্লাটফর্মে সবকিছুই করা হচ্ছে খুব দ্রুতগতিতে। কিন্তু একটা বিষয় আমরা কখনই ভাবছি না যে যত দ্রুত শিক্ষার্থীদের এগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে, তত দ্রুত আসলে তারা গ্রহণ করতে পারবে কিনা। সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার তাড়াহুড়ো, পার্কে দৌড়াদৌড়ি, জন্মদিনের পার্টি বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা সব মিলিয়ে তাদের জীবনে এমনিতেই একটা বড় ধাক্কা। তার ওপর সারা দিন বাড়িতে বসে চলছে পড়াশোনার চাপাচাপি। এজন্য শিশুর মনের মধ্যে কী চলছে, নতুন বিষয়গুলো নিয়ে তারা কী ভাবছে, কীভাবে তারা এগুলোয় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এগুলো কিন্তু বাবা-মায়ের দায়িত্ব। তাই নতুন বিষয়গুলো চাপিয়ে না দিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করুন, যেন শিশুরা মানসিক চাপে না ভোগে।
আগে যেখানে বিদ্যালয় থেকে ফিরে শিক্ষার্থীরা বাড়িকে আরামের জায়গা মনে করত, সেই বাড়ির চরিত্র বদলেছে। বাড়িই এখন বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার বা টিভি দেখে তারা যেখানে মজার সময় পার করত, সেটা এখন পড়াশোনার উপকরণে পরিণত হয়েছে। তাই এ পরিস্থিতিতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়া জরুরি বলে মনে করেন বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেসের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি বলেন, বাড়ি থেকে কাজ করা আর বাড়ি থেকে পড়াশোনা করা এক নয়। বাড়ি ও বিদ্যালয় বা ঘরে ও বাইরে ভারসাম্য গড়ে তোলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রযুক্তিগত আসক্তি নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনলাইন প্লাটফর্মগুলো শিশুদের মনোনিবেশের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত ও অসুবিধার সৃষ্টি করতে পারে। আর তারা এমন পরিবেশের জন্য অভ্যস্ত নয়। তাদের গতিময় পরিবেশ দরকার। যেহেতু বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে খেলার পরিস্থিতি এখন নেই, তাই তারা অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কায় ভুগতে পারে।
ডা. বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রযুক্তি এমন একটি সময়ে ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যখন বাইরের বিশ্বটি তালাবদ্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই সবাইকে যত্নসহকারে পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষ করে যখন এটা ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আসে। চতুর্থ শ্রেণীর নিচের শিশুদের জন্য অনলাইন ক্লাস উপযুক্ত নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল কাজের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে। শেখানো ও শেখার প্রচলিত ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করে বাবা-মায়ের হালকা তত্ত্বাবধানই এখন তাদের জন্য যথেষ্ট। আজকের দিনে একটি ভালো রুটিন, শারীরিক অনুশীলন ও বাবা-মায়ের জড়িত হওয়া শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আউটলুক ম্যাগাজিন





