কভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ধারণা করা হচ্ছে আগামী বছরও স্থায়ী হবে। ফলে সমাজের আগের অবস্থায় ফেরার বিষয়টিও সেই পর্যন্ত থমকে থাকবে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট এবং ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মতো কভিড-১৯-এর প্রভাব বৈশ্বিক সচেতনতাকে পরিবর্তন করেছে এবং সুরক্ষা, গোপনীয়তা, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তাকে পুনরায় উন্মুক্ত করেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৯/১১ এবং ২০০১ সালের অ্যানথ্রাক্স আক্রমণের মতো বর্তমান কভিড-১৯ মহামারীও পদ্ধতিগত অবকাঠামো এবং সুরক্ষা ঘাটতিকে উন্মোচিত করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকে ক্ষমতা হ্রাসের দিকে চালিত করেছে। উন্নত প্রস্তুতির মাধ্যমে অবশ্য এটাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। এ প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন সরকার, গবেষক ও শিল্পগুলোর মাঝে সহযোগিতা ও স্বচ্ছতা তৈরি করা। 

কভিড-১৯-এর কারণে দেশগুলো যেভাবে অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত ধাক্কা খেয়েছে, ফলে কোনো কোনো দুষ্কৃতকারী একই রকম বায়োওয়েপন বা জৈব অস্ত্র ব্যবহার করে সুবিধা নিতে চাইবে, যার প্রভাবও হবে একই রকম।

জৈব নিরাপত্তার বৈশ্বিক হুমকি

বর্তমান মহামারীর মতো যেকোনো জৈব নিরাপত্তাজনিত হুমকি ও মহামারী সহজেই বৈশ্বিকভাবে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। জীবাণু কোনো সীমানা চেনে না এবং বাছবিচার ছাড়াই এটি ছড়াতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দরিদ্র দেশগুলোকে অসামঞ্জস্যহীনভাবে প্রভাবিত করে।

বিশ্বায়ন, যাকে বিশ্লেষণ করা হয় কভিড-১৯-এর বিস্তৃতির সহায়ক হিসেবে। যা কিনা একইভাবে মানুষের তৈরি কিংবা প্রাকৃতিকভাবে সংগঠিত রোগের বিস্তারকে ব্যাহত করতে পারে, বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে অক্ষত রেখে।

প্রতিক্রিয়া হতে হবে বৈশ্বিক, কারণ মহামারী এবং সন্ত্রাসী হামলাগুলো স্থায়ী ও মারাত্মক প্রভাব তৈরি করে। ফলে এটি একক রাষ্ট্র অর্থনীতির সঙ্গে বিশেষভাবে আবদ্ধ নয়।

এ রকম প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ভাইরাসের বিকাশ ও বৃদ্ধি থামাতে সরকারগুলো অবশ্যই সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য ও আমাদের অংশীদারিমূলক পরিবেশকে পরিচালনা করে এমন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কগুলো পুনর্বিবেচনা।

সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার বিকাশ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়াটি হচ্ছে আন্তঃসরকারি সহযোগিতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সম্মতি। এটি জৈব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তথ্য ভাগাভাগি করা এবং কার্যকর অভিবাসী কৌশলের সঙ্গে যুক্ত।

আজকের দিনে নজিরবিহীন ও উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক ঐক্য প্রদর্শিত হয় বিজ্ঞানীদের ভ্যাকসিনের বিকাশের জন্য মুক্তভাবে কভিড-১৯-সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে।

সরকারগুলোকে এবং তাদের সহায়কদেরও অবশ্যই ভুল তথ্যের বিস্তৃতি রোধ করতে হবে উদ্বেগ ও জনগণের ভয়কে প্রশমিত করার জন্য। এর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে, যা অবশ্যই রাসায়নিক বিষক্রিয়ার দিকে চালিত করা জনপ্রিয় ও রাজনৈতিক মতামত থেকে পৃথক হওয়া উচিত। 

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নাগরিক অশান্তি ও অস্থিরতা, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাত তৈরি করার জন্য নিঃসন্দেহে জৈব অস্ত্রের বিস্তৃতিকে ব্যবহার করবে। এটি প্রয়োগ করা হবে সেসব দেশে যা কিনা নানা ধরনের সংঘাতের ভেতর দিয়ে এরই মধ্যে এক ধরনের অস্থির সময় পার করছে। ফলে এটি দ্রুত বিস্তৃতি পাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এরই মধ্যে চলতে থাকা প্রতিযোগিতা এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে। মহামারী ও সন্ত্রাস থেকে মুক্তির উপায় অনিবার্যভাবে নির্ভর করছে জাতীয় অবকাঠামোকে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়ার ওপর।

বায়োটেকের প্রয়োগ

তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করেছে প্রটোকল প্রয়োগ করার মাধ্যমে, যা নাগরিকদের রক্ষার কাজ করেছে। যেখানে বিশ্লেষণী প্রযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে স্ক্রিনিং এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আইসোলেটেড করার জন্য কিংবা কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য। 

দক্ষিণ কোরিয়ায় কেস ট্র্যাক করার জন্য এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য প্রতিদিন ২০ হাজারের বেশি মানুষকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এদিকে চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুদ এবং অস্থায়ী হাসপাতাল ইউনিট প্রস্তুত করা হয়েছে অভাব দূর করার জন্য এবং কালোবাজারিকে হ্রাস করার জন্য। যদিও চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেলে রাখা যায় না এবং চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পরিসংশোধনের জন্য সম্ভবত অপ্রচলিত উপায়ের প্রয়োজন। এদিকে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেডিকেল সরঞ্জামের চাহিদা মেটাতে থ্রিডি প্রিন্টার্স প্রয়োগ করে মাস্ক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরির ব্যাপারে সাহায্য করেছে।

কানাডিয়ান সরকার নতুন চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি এবং ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজিতে বিনিয়োগ করছে, যা কিনা পরবর্তী সময়ে জৈব অস্ত্র চিহ্নিতকরণের জন্য পুনরায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিভাইরাল বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত। যা কিনা ভবিষ্যতের রোগের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে শক্তিশালীভাবে কাজ করতে পারে। করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত প্রজেক্টে এখন কানাডিয়ান সরকার অর্থায়নও বৃদ্ধি করেছে।

পরিচালনার কৌশল

জৈব অস্ত্র রোধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজন আগ্রাসী কৌশলের। এতে বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীদের বিরুদ্ধে হওয়া নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক আইনও প্রয়োগ করতে হবে। এটি করতে হবে মূলত অনিচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস এবং সংক্রামক রোগের মিশ্রণ রোধ করার জন্য। ভূমি পুনরুদ্ধার এবং বাসস্থান রক্ষার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য হারানোর যে আশঙ্কা তাকেও রোধ করা যাবে এবং ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগও কমিয়ে আনা যাবে।

জৈব সন্ত্রাস ও মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রযুক্তি যেমন স্মার্টফোন এবং ড্রোনের ব্যবহারও করা যেতে পারে। 

জনসাধারণের সহযোগিতা

সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য জনগণকেও আগ্রহের সঙ্গে সরকারি যেসব নীতি তাতে সহযোগিতা করতে হবে। জাতীয় সীমানা বন্ধ করা এবং কোয়ারেন্টিন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কভিড-১৯-এর বিস্তৃতি কমানো গেছে। কিন্তু জনগণের সহযোগিতা জরুরি সর্বসাধারণের মঙ্গলের জন্য।

সরকারকে অবশ্য প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং এপিডেমিওলজিস্টদের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। সে সঙ্গে অতীতের সবগুলো মহামারী আমাদের প্রস্তুত করতে পারে ভবিষ্যতের অনিবার্য বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব এবং সম্ভাব্য জৈব সন্ত্রাসী হামলা মোকাবেলায়।

স্ক্রলডটইন