চলতি বছরের প্রথম মাসেই আমরা আরো একবার দেখেছি আমাদের পৃথিবী কতটা ভঙ্গুর এবং বিশৃঙ্খলার ভেতর পিছলে পড়া কতটা বিপজ্জনক। যেখানে বিশ্বের সব দেশ একই শত্রু কভিড-১৯-এর মুখোমুখি হচ্ছে, কোনো দেশই এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ নতুন এ ব্যাধিযুক্ত শত্রুকে হারানো। কিন্তু এমনকি এ সময়েও আমাদের ভাবতে হবে এর থেকে সেরে ওঠার পরের জীবন নিয়ে।
আমাদের মাঝে অনেকেই বলছে, পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। কিন্তু এটা আসলে কেমন হবে? এটা আসলে নির্ভর করছে কেমন শিক্ষা আমরা নিচ্ছি তার ওপর।
আমার মনে পড়ছে ১৯৮০-এর দশকে কীভাবে আমরা পারমাণবিক হুমকির মোকাবেলা করেছি। সাফল্য তখনই এসেছে যখন আমরা বুঝতে পারলাম যে এটা আমাদের সাধারণ শত্রু। আমাদের সবার জন্য হুমকি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করল যে পারমাণবিক যুদ্ধ কখনো জেতা যায় না এবং অবশ্যই এ লড়াই করা উচিত নয়। এরপর এল রিকজভিক, যেখানে প্রথম চুক্তি ছিল পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করা। অবশ্য ৮৫ শতাংশ গোলাবারুদ ধ্বংস করার পরও, এখনো সেখানে হুমকি থেকে গেছে।
এখানে আগে থেকেই কিছু বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং তারা আরো বেশি জরুরি। যেমন দারিদ্র্য, বৈষম্য, পরিবেশের ক্ষয়, পৃথিবী ও মহাসাগরের অবক্ষয়, অভিবাসী সংকট ইত্যাদি। এর সঙ্গে এখন নতুন হুমকি যুক্ত হলো। রোগ এবং মহামারী। যা কিনা আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে অভূতপূর্বভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নতুন এ চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া কখনো জাতীয় পর্যায় থেকে হতে পারে না। যদিও জাতীয় সরকারগুলোকে এর ফলে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে পুরো বিশ্বসম্প্রদায়কে।
আমরা এখন পর্যন্ত মানবজাতির জন্য সাধারণ কৌশল এবং লক্ষ্য নির্ধারণ ও প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছি। জাতিসংঘের নেয়া মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের পথে যাত্রাও বেশ অসম ছিল। আমরা আজ দেখছি মহামারীর যে পরিণতি, তার ফল সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। যা বৈষম্যের স্বরূপকে আরো প্রকট করে তুলেছে।
এখন আমাদের যা করতে হবে তা হলো নিরাপত্তার যে ধারণা তা নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হবে। এমনকি স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একে বেশির ভাগ সময় ভাবা হয়েছে সামরিক পরিভাষায়। কয়েক বছর ধরে আমরা যা শুনছি তা হচ্ছে অস্ত্র, মিসাইল ও বিমান হামলা সম্পর্কিত আলাপ।
এ বছরও পৃথিবী এরই মধ্যে বেশকিছু সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। যা কিনা ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার মারাত্মক শত্রুতাসহ অসীম শক্তিকে যুক্ত করতে পারে। যদিও অংশগ্রহণকারী শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছে। এটা ছিল ব্রিংকম্যানশিপের একই বিপজ্জনক ও বেপরোয়া নীতি।
এটা কি আমাদের কাছে এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হচ্ছে না যে যুদ্ধ ও অস্ত্রের এই যে প্রতিযোগিতা আজকের দিনে বৈশ্বিক সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পারে না? যুদ্ধ হচ্ছে পরাজয়ের স্মারক এবং তা রাজনীতির পরাজয়ও বটে।
আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হতে হবে মানুষের নিরাপত্তা। যার মাঝে রয়েছে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা। এছাড়া পরিষ্কার পরিবেশ প্রদান করা এবং মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রতি যত্নবান হওয়া। এটা অর্জন করতে হলে আমাদের কৌশল ঠিক করতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে, তৈরি করতে হবে পরিকল্পনা এবং মজুদ রাখতে হবে। কিন্তু সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি সরকার অর্থের অপচয় করে কেবল অস্ত্র প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার জন্য।
আমি কখনো এটা বলতে ক্লান্ত বোধ করব না যে আমাদের বৈশ্বিক ঘটনা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক চিন্তার যে পদ্ধতি তাকে অসামরিকীকরণ করতে হবে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে আন্তর্জাতিকভাবে এটাকে মোকাবেলার জন্য আমি বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন জাতিসংঘের সাধারণ সভায় একটি বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সাপেক্ষে অতি দ্রুত যেন এটি আয়োজন করা হয়। এটা যেন হয় বিশ্ব এজেন্ডার একটি পুনঃপাঠ। বিশেষ করে আমি তাদের আহ্বান জানাব সামরিক খাতে খরচ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমানোর জন্য। ন্যূনতম এটুকু তাদের এখন করতে হবে। যা কিনা নতুন চৈতন্য ও সভ্যতার পথে প্রথম পদক্ষেপ হবে।
টাইম ম্যাগাজিন





