নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কার্যত স্থবির হয়ে আছে পৃথিবী। লকডাউনের কারণে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবকিছুই বন্ধ। অনেক দেশের শেয়ারবাজার এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। সব মিলিয়ে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী যতটা ক্ষতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, পরিমাণটা তারচেয়ে বেশি হবে নিঃসন্দেহে।
মূলত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। চীনে শুরু হলেও এটি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় নেয়নি। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এটা কেবল ২০২০ সালেরই নয়, চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনা। তবে ভয়ের কথা হচ্ছে, করোনা এখনো তার শক্তি হারায়নি। কখন এর প্রকোপ থামবে তা-ও নিশ্চিত নয়। তবে যতই দিন গড়াবে, এ ভাইরাসের কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।
স্তব্ধ পৃথিবী
করোনা যতই তার ডালপালা বিস্তার করেছে, দ্রুততম সময়ের মাঝে লকডাউন হয়ে পড়েছে দেশের পর দেশ। পৃথিবীর এ স্তব্ধ হয়ে পড়া যে অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে যাচ্ছে, শুরুতেই সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় চীন থেকে। প্রকোপ কমার আগেই কল-কারখানা খুলে দেয়ার জন্য চাপ তৈরি হতে থাকে। এ সময়ের মাঝে চীনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। বন্দরও খালি পড়ে ছিল।
তবে এমন নয় যে চীনেই সেটা সীমাবদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইরান, ইতালি ও স্পেনসহ বহু দেশ দ্রুতই চীনের পথে হাঁটা শুরু করে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে ঠেলে দিয়েছে ধ্বংসের দিকে। বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন এরই মধ্যে ধসে পড়েছে।
ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বহু মানুষকে ঠেলে দিয়েছে বেকারত্বের দিকে। খেলাধুলা ও বিনোদনসহ বড় আয়োজনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে করোনার থাবা পড়েনি। তবে কঠোর অবস্থানও দেশগুলোকে বাঁচাতে পারেনি বড় ধরনের আঘাত থেকে এবং তা এখনো চলছে। প্রতি মুহূর্তে তাই একটু একটু প্রাণ হারাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছু।
আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা
কেবল চীনেই যখন ভাইরাস বিস্তৃতি লাভ করছিল, তখন পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়নি। খুব পিছিয়ে থাকা অঞ্চলেও খাদ্য ও পানি পৌঁছে গিয়েছিল। সেজন্য স্বেচ্ছাসেবক ও ডেলিভারির কাজে নিয়োজিতদের বীরত্বের কথা স্মরণ করতে হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আর একই রকম থাকেনি। অবস্থাসম্পন্ন মানুষেরা আতঙ্কিত হয়ে ইচ্ছামতো কেনাকাটা করেছে, যা এক দেশ থেকে অন্য দেশের জনগণের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে অনেক দেশে টিস্যু পেপারের সংকট পর্যন্ত দেখা গেছে। চাহিদার কারণে অনেক পণ্যের দামও বেড়েছে। ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপার মার্কেট মুহূর্তের মাঝে খালি হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বড় ঝড়টা যাচ্ছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ওপর। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এ জিনিসগুলোর সংকট এখনো দূর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের অরক্ষিত রেখেই রোগীর সেবা দিতে হয়েছে তাদের।
এমন আতঙ্কিত কেনাকাটার ফলে তৈরি হয়েছে বৈষম্যও। বিশেষ করে দ্রুত দাম বাড়তে থাকায় নিম্নআয়ের মানুষের জীবন ধারণ করাও হয়ে পড়ে দুর্বিষহ, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্ণবাদ ও বিভাজন
চীনে প্রাথমিকভাবে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শুরু হয় অ্যান্টি-এশিয়ান বর্ণবাদী আচরণ। প্রথমদিকে চীনা পাসপোর্টধারীদের নানাভাবে হয়রানি করার খবরও সামনে আসতে শুরু করে। কোথাও কোথাও তাদের নিষিদ্ধও করা হয়। এরপর চীনের আশপাশের দেশের মানুষদেরও পড়তে হয় একই রকম বিপদে। এক পর্যায়ে এশিয়ার যে অঞ্চলের মানুষই হোক না কেন, ইউরোপ-আমেরিকায় হয়রানিতে পড়তে হয় তাদের।
কেবল তা-ই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার কালো বর্ণের মানুষদেরও পড়তে হয় হুমকিতে। অনেকেই দাবি করেন ভাইরাস থেকে বাঁচতে মাস্ক পরলে বর্ণ বৈষম্যের কারণে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণত এক হয়ে লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত থাকলেও করোনাতে তেমন কিছু দেখা যায়নি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দায় চাপানোর চেষ্টা। সেই সঙ্গে সামনে আসতে শুরু করেছে ষড়যন্ত্র তত্ত্বও। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত চীনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুদান বন্ধ করার ঘোষণা, যা উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দরিদ্র দেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের যে মাত্রা, তা আরো বাড়িয়ে দেবে।
পদ্ধতিগত ব্যর্থতা
উপরোল্লিখিত পরিস্থিতির কারণে একটি আরেকটির চেয়ে অধিক খারাপ হয়েছে। একটি ভয় আরেকটি ভয়কে জাগিয়ে তুলেছে। শাটডাউনের কারণে মানুষের মাঝে যে ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে বাজারে এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। বিভাজনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যা শুরু হয় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়েই। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয়েছে সেসব অঞ্চলের, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর যেখানে পুরো কাঠামো ধসে পড়েছে।
করোনার প্রাদুর্ভাব ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও। ভাইরাস আক্রান্ত না হয়েও কেবল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়ের কারণে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আসন, জনবল, অ্যাম্বুলেন্স ও সরঞ্জামের সংকটও দেখা দিয়েছে।
তবে এসব সংকটেও বেশি ক্ষতি হয়েছে মধ্যম ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলো। যেখানে তাদের সমস্যা আরো বেশি প্রকট। এসবের মাঝে আরো হতাশার খবর, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দীর্ঘসূত্রতা। সে পর্যন্ত কেবল সচেতনতা ও যোগ্য নেতৃত্বই কমাতে পারে এ ক্ষতির পরিমাণ।
ফরেন পলিসি





