ইউরোপের কভিড-১৯-এর বিস্তৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে চারটি হটস্পটে (স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স) হঠাৎ করেই আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে তা দৈনিক দুই অংকের সংখ্যায় নেমে এসেছে।

এমনকি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রও আক্রান্ত ও মৃতের দিক থেকে প্রাথমিক চূড়া স্পর্শ করার পর এখন অবস্থা পুনরুদ্ধারের একটি পথ খুঁজে পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে কি অন্যদের নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষা নেয়ার আছে? শীর্ষে পৌঁছার পর এই দেশগুলোর সংক্রমণ কি এখন হ্রাস পেতে শুরু করেছে? সেরে ওঠার হারের উত্থান কি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত? সংক্রান্তের সংখ্যা এখন কমতির দিকে, এটা কি ভাইরাসের নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

বর্তমান মহামারী অভিনব। এজন্য না যে এটা নতুন ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, যা সবাইকে ঝুঁকিতে রেখেছে বরং এজন্য যে বাহকের ইমিউনিটির বৈপরীত্যের কারণে।

অভিযোজক ইমিউনিটি, যা অনেক বেশি ক্ষমতাশালী, দীর্ঘস্থায়ী ও বহুল-কাঙ্ক্ষিত, তা দমিত হয়। এখানে চ্যালেঞ্জ হলো উভয়ের মাঝে অনুকূল ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য চিকিৎসা কৌশলগুলোর বিকাশ সাধন করা। যাতে ভাইরাসের প্রতিলিপি বন্ধ হয় এবং ভাইরাস সংক্রমিত কোষগুলোর বিনাশ ত্বরান্বিত হয়।

কভিড-১৯ রোগীদের মাঝে সংক্রমণের হার এবং এর তীব্রতা জনসংখ্যার মাঝে অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। জুনের ১৬ তারিখ পর্যন্ত ২১৬টি দেশে বা অঞ্চলে ৮.১৫ মিলিয়ন কেস এবং ৪ লাখ ৩৯ হাজার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভারতের মতো দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, যেখানে সম্প্রতি সংক্রমণ বাড়ার পরও পরিসংখ্যান আশ্চর্যজনকভাবে কম। বিশেষ করে ইউরোপের হটস্পট ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়। পাশাপাশি যা আরো বেশি উল্লেখযোগ্য তা হলো ভারতের মতো দেশে তীব্র কিংবা গুরুতর কেসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সর্বমোট পজিটিভ কেসের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশ কম (৩ শতাংশের কম)।

নির্দিষ্ট জনসংখ্যার মাঝে সংক্রমণের হার এবং ভিন্ন প্যাটার্নের (রোগাক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যু) দিক থেকে বৈচিত্র্যের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে ভাইরাসের পরিবর্তিত বা প্রতিলিপি হওয়া এবং বাহকের সংবেদনশীলতা। এগুলো একটি অন্যটির ওপর নির্ভরশীল এবং একসঙ্গে হয়ে সংক্রমণের প্রকাশ ঘটায়।

একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যে ভাইরাস বিপজ্জনক, অন্য ক্ষেত্রে সেটি তেমন বিপজ্জনক নাও হতে পারে। অন্যদিকে বাহকের সংবেদনশীলতা নির্ভর করে জিনের জিনগত বৈচিত্র্যের ওপর, যা কিনা জনগণের ইমিউনের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। পরেরটি বৈচিত্র্যময় মাইক্রোবিয়াল এবং ভৌগোলিক চাপ দ্বারা আকারপ্রাপ্ত হয়, যা কিনা বিবর্তনমূলক নির্বাচন দ্বারা নির্দেশক হয় এবং নতুন রোগজীবাণু থেকে ইমিউনিটিপ্রাপ্ত হয়।

একবার চূড়া স্পর্শ করা হলে ভাইরাস প্রতিলিপি তৈরি করতে থাকে, যদিও তা ইমিউন রিকভারির নিম্ন স্তরে থাকে, যা রিকভারির শতাংশকে তুলে ধরে।

এটা লক্ষণীয় যে যেসব দেশে সেরে ওঠার হার ৭০ শতাংশ এবং তার বেশি তাদের সবাই নতুন কেস এবং দৈনিক মৃতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখতে পেরেছে। তথাকথিত স্মোলডারিং (ধীরে ধীরে সংক্রমিত হওয়া) সংক্রমণ অনেক বেশি উপসর্গবিহীন কেসের দিকে চালিত করে, যা কিনা ইমিউনিটির উন্নতি সাধন করে। সরকারগুলোর উচিত লক্ষণ আছে এমন আক্রান্তদের চিহ্নিত করা এবং আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া।

নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো এর মাঝে সুখবর দিয়েছে। যারা কিনা প্রথম দেশ হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসে (যদিও নতুন করে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে)। তাদের পার্শ্ববর্তী অস্ট্রেলিয়ার সেরে ওঠার হার ৯২ শতাংশ। তারাও এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।

ভারতের মতো দেশে ১ জুন থেকে মানুষের কার্যকলাপ শুরু হওয়ায় দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এটি রিকভারিকে সপ্তাহ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাস খানেক পিছিয়ে দিয়েছে। মনোযোগ দেয়া উচিত ভাইরাসের গতি রোধ করার দিকে। এটি অর্জনের জন্য অভিনব কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হবে, যা রাজ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত ৭০ শতাংশ পর্যন্ত রিকভারি অর্জন করা।

ভারতের অবস্থা রাশিয়া কিংবা ব্রাজিলের চেয়ে খুব একটা পৃথক নয়। দুটি দেশই সর্বোচ্চ চূড়া ছুঁয়েছে এবং প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, শিগগিরই চূড়া স্পর্শের পাশাপাশি সংক্রমণের সংখ্যা ভারতের মতো দেশে কমতে দেখব কিনা। তবে এত বড় দেশে একটি নির্দিষ্ট চূড়া আশা করা ঠিক হবে না এবং ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে এর হ্রাসের মাত্রাও আলাদা হবে।

বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো আরো অনেক লোক আক্রান্ত হবে এবং মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তিনটি নীতি মেনে চলতে হবে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়ম মেনে চলা। এগুলোই আপাতত মহামারীকে আটকে রাখতে পারে।

হিন্দুস্তান টাইমস