আমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রকৃতির নিজের সূক্ষ্ম কিছু উপায় আছে। এক শতাব্দী ধরে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে আমরা অর্থনীতির প্রভূত বিকাশ দেখেছি। যে কারণে আমরা ধরেই নিয়েছি প্রকৃতির ওপর আমাদের সভ্যতার নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেয়ারবাজারের অযৌক্তিক উল্লম্ফন যেভাবে শুধরানো হয়, সেভাবেই কভিড-১৯ মানুষের ঔদ্ধত্যকে সংশোধন করার জন্য এসেছে। প্রকৃতি এখন সব মানুষকে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। এ শিক্ষায় ধনী কিংবা গরিবের কোনো বৈষম্য নেই। সমান ও বৈষম্যহীনভাবে এ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষকে। যদিও আমরা ভেবেছিলাম, আমরা প্রকৃতিকে আমাদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারি। নিজের ইচ্ছামতো শাসন করতে পারি এবং সেটিই আমরা এতদিন ধরে করে এসেছি। এখন তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রকৃতি আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে আদিম করোনাভাইরাস, যার সম্পর্কে খুব সামান্য তথ্যই আমাদের কাছে আছে। এটি এমন একটি ভাইরাস, যা কিনা আমাদের মেরে ফেলতে পারে। সেসঙ্গে ধ্বংস করে দিতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে। পাশাপাশি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সামাজিক যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, তা সরাসরি স্বাস্থ্যগত প্রভাবের মতোই সমান ক্ষতিকর। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি অনেক আগে থেকেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি অনুশীলন করে আসছি। আমার মনে হয়, কভিড-১৯-এর প্রকোপের আগেই এটা পরিষ্কার হয়েছিল যে আমরা মূলত দার্শনিক গটফ্রিড লাইবনিজের ‘মোনাড’-এর ধারণার মতো (বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক উপাদান হিসেবে মোনাডের কথা বলেছিলেন লাইবনিজ। কিন্তু এর স্থানিক প্রসারণের অভাব থাকে, যে কারণে এটি অবাস্তব)। 

একটা দিক বিবেচনায় সামাজিক দূরত্ব অবশ্য মুক্তচিন্তার জন্য বেশ সুবিধাজনক। ১৬৬৫-৬৬ সালে লন্ডনে যখন প্লেগের মহামারী চলছিল, তখন আইজ্যাক নিউটন তার সেরা বৈজ্ঞানিক কাজগুলো করেছিলেন বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘরে বসে। সে সময় ক্যামব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এক বছরের বেশি সময় স্বাধীনভাবে কাজ করে তিনি ক্যালকুলাস, অপটিকস এবং মাধ্যাকর্ষণের গতি-প্রকৃতি আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এখানে শিক্ষা নেয়ার মতো আরো একটি বিষয় আছে। ‘বিফোর হুইটসানডে ১৬৬২’ নামে পাপের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন নিউটন। যার ১৩ নম্বরে ছিল ‘বাবা-মাকে তাদের ঘরসুদ্ধ জ্বালিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া।’ ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে অবশ্য আমি আমার মেয়েদের কাছে ভালো থাকার চেষ্টা করছি।

অস্তিত্ববাদী এ শিক্ষার বাইরে কভিড-১৯ আন্তর্জাতিকভাবে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ধারণা নিয়ে এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে বিজ্ঞানের কোনো সীমানা নেই, বিশেষ করে যখন এটি সভ্যতাকে উন্নত করার ধারণা নিয়ে আসে। যেভাবে নভেল করোনাভাইরাস সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে এবং ভ্যাকসিনের সফল আবিষ্কার সবাইকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আর সে লক্ষ্যেই এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন। যে কারণে বৈজ্ঞানিক সাফল্য যে-ই পাক, তা সবাই ভাগাভাগি করতে পারবে। বিজ্ঞান কোনো শূন্যের যোগফল নয়, বরং এটি অসীমের যোগফলের খেলা। আশা করা যায়, কভিড-১৯-এর ফলে যে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাসম্পন্ন মনোভাবের উদ্ভব হয়েছে, তা দেশগুলোকে ভবিষ্যতে সদিচ্ছা এবং আরো ভালো রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির দিকে নিয়ে যাবে। 

সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষাটা অবশ্য আমাদের জন্য আরো সরল, যা হচ্ছে প্রকৃতির প্রদত্ত সব ভালো কিছু নিশ্চিত ধরে না নিয়ে আমাদের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ এটি সহজেই মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যেতে পারে। যার ফলে আগামী এক শতাব্দীর মাঝে আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি অজস্র অর্থ। কভিড-১৯-এর মতো মহামারীর কারণেই কেবল নয়, এটি হতে পারে সৌর শিখা কিংবা গ্রহাণুর প্রভাবে। সেসব পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই আমাদের নিজেদের রক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। নয়তো আমাদের জন্য আরো ভয়ংকর কিছুই অপেক্ষা করে আছে। 

এমনকি দীর্ঘ সময়ের জন্য আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারি আমরা। যেমন কাছাকাছি নক্ষত্রগুলোর বিস্ফোরণ কিংবা উত্তপ্ত সূর্যের তাপ, যা আমাদের মহাসাগরগুলোকে এখন থেকে এক বিলিয়ন বছরের কম সময়ের মাঝে ফুটিয়ে তুলবে।

আমরা জীবনকে যেমন জানি এটা মহাবিশ্বের বিশ্ব পরিকল্পনার একটি ক্ষুদ্র অনুচিন্তা মাত্র। মহাবিশ্ব মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের গঠন দ্বারা শুরু হয়েছিল। ভারী উপাদান যেমন কার্বন ও অক্সিজেন, যা কিনা জীবনের রাসায়নিক উপাদান। তা হলো নক্ষত্রের পারমাণবিক প্রজ্বলনের ফলে পাওয়া ‘ছাই’। পৃথিবীতে আমাদের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব টিকে থাকবে মহাজাগতিক ইতিহাসের তুলনায় খুবই সামান্য সময়। আমাদের তাই উচিত আকস্মিক সৃষ্ট এ পরিস্থিতিকে ধন্যবাদ দেয়া, যা কিনা আমাদের টিকে থাকাকে সাহায্য করে। যেগুলো একদিন নিশ্চিতভাবেই কভিড-১৯সহ কিংবা ছাড়াই চলে যাবে।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকানে প্রকাশিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের প্রধান আভি লোয়েবের রচনার ভাষান্তর