বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক প্রধান এবং নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্রো হারলেম ব্রান্ডল্যান্ড। তিনি গত সেপ্টেম্বরেই সম্ভাব্য মহামারীর বিষয়ে সচেতন করেছিলেন বিশ্বকে। ব্রান্ডল্যান্ড সম্প্রতি চলমান মহামারী সম্পর্কে ডার স্পিয়েগেলকে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে ভবিষ্যতের মহামারীর ভয়াবহতা সম্পর্কেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার সেই সাক্ষাত্কারের চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো—

 স্পিয়েগেল: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে। যারা কিনা সংস্থায় সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়ে থাকে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংস্থার ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে?

ব্রান্ডল্যান্ড: এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থবিরোধী। আমার বিবেচনায় এটা সম্পূর্ণভাবে ভুল। তবে আমি মনে করি না, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরিভাবে অর্থায়ন বন্ধ করতে পারবে।

স্পিয়েগেল: কিন্তু ট্রাম্পকে খুবই প্রত্যয়ী মনে হয়।

ব্রান্ডল্যান্ড: হয়তো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টই শেষ কথা নয়। এখনো ওয়াশিংটন কংগ্রেস আছে। পাশাপাশি ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আছে। সে পর্যন্ত হয়তো অর্থায়ন বন্ধ রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমি ভাবতে পারি না বা ভাবতে চাই না যে পুরোপুরিভাবে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

স্পিয়েগেল: কিন্তু যদি তা হয়েই যায়?

ব্রান্ডল্যান্ড: আমেরিকা চলে গেলে অন্য সদস্যরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে। জার্মানি, ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং আরো অনেক দেশ খুব ভালোভাবেই জানে যে তাদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে প্রয়োজন আছে এবং সেজন্য তাদের সেখানে অবশ্যই অবদান রাখতে হবে।

স্পিয়েগেল: এটা পরিষ্কার যে চীন প্রাদুর্ভাবের শুরুতে তথ্য গোপন করেছে। ট্রাম্প এবং আরো অনেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে বেইজিংকে সহযোগিতার অভিযোগ আনেন। ঘটনাটা আসলে কী ছিল?

ব্রান্ডল্যান্ড: চীনকে সমালোচনা করার কারণ আছে। সেখানে যারা এ বিষয়ে দায়িত্বে ছিল তারা খুবই ধীরগতিতে কাজ করেছে। তারা অনেক দেরিতে বার্তা দিয়েছে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, মানুষে মানুষে যে সংক্রমণ ছড়ায় এটা স্বীকার করতে তারা অনেক সময় নিয়েছে। এই সংক্রমণের বিষয়টি জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, এখন আমরা তা বুঝতে পারি। কিন্তু জানুয়ারির ২০ তারিখের আগে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি। একটি ভিন্ন প্রশ্ন হচ্ছে, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল কিনা। অনেক প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থসহ চীন অনেক বড় দেশ। নিশ্চিত কোনো রায় দেয়ার আগে তাই আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

স্পিয়েগেল: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি নিজেকে চীনের আরো অনেক কাছাকাছি নিয়ে গেছে?

ব্রান্ডল্যান্ড: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যত তাড়াতাড়ি যথাসম্ভব তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এর জন্য সংস্থাকে নির্ভর করতে হয় সদস্যদেশগুলোর ওপর। কারণ এই রাষ্ট্রগুলোতে তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। শুরু থেকেই সংস্থার বিশেষজ্ঞরা চীন থেকে অনেক তথ্য চেয়ে আসছিলেন। বেইজিংয়ের ওপর আরো চাপ দেয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ হতো? এটা বলা মুশকিল।

স্পিয়েগেল: যখন আপনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ছিলেন, আপনি তো তা-ই করেছিলেন। ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় চীন যখন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, আপনি চাপ প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছিলেন।

ব্রান্ডল্যান্ড: সে সময় কোনো সন্দেহ নেই যে চীন মহামারীকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা কোনো তথ্যই পাইনি। আমাদের বেইজিং অফিসের প্রধানকে অজুহাত দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়। অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে আমরা কিছু বিষয় জানতে পারি। কিন্তু চীন সহযোগিতা করবে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আমাকে জনসম্মুখে খুব স্পষ্টভাবে কথা বলতে হয়।

স্পিয়েগেল: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসুস ভিন্ন রকম আচরণ করেছেন। জানুয়ারিতে চীন যখন তথ্য গোপন করেছিল, তখন তিনি দেশটির প্রশংসা করেছিলেন। তিনি কি অতিরঞ্জিত ভূমিকা নিয়েছিলেন?

ব্র্রান্ডল্যান্ড: সম্ভবত। কিন্তু হয়তো তার উদ্দেশ্য ছিল চীনকে আরো নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করা। ২০০৩ সালের পর থেকে বিশ্ব নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। চীন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। কেউ যদি জনসম্মুখে দেশটির সমালোচনা করে, যেমনটা আমি করেছিলাম, বর্তমানে ঝুঁকি আছে যে চীন নিজেকে সেক্ষেত্রে সরিয়ে নিতে পারে।

স্পিয়েগেল: সেপ্টেম্বরে, আপনি মহামারীর বিপদ সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যখন আপনি কয়েক মাস পরই জানলেন যে উহানে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে তখন কেমন অনুভূতি হয়েছিল?

ব্রান্ডল্যান্ড: প্রথম দিকে আমি আশা করেছিলাম কেবল প্রাণীদেহ থেকেই এ রোগ ছড়াবে। মধ্য জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষকে সংক্রামক ভাবা হচ্ছিল না। তাত্ক্ষণিকভাবে আমি খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। এটা চরম দুঃসংবাদ ছিল।

স্পিয়েগেল: সে সময় আপনি কি জানতেন বিশ্ব একটি মহামারীর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?

ব্রান্ডল্যান্ড: এটা ভেবে আমি বেশ ভয় পেয়েছিলাম। আমি ধরে নিয়েছিলাম যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খুব দ্রুতই সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করবে এবং জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠবে।

স্পিয়েগেল: কিন্তু ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই দ্বিধা কি ভুল ছিল?

ব্রান্ডল্যান্ড: এর মানদণ্ড কী তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞদের মাঝে ভিন্নমত ছিল। আন্তর্জাতিকভাবে ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে এটা সম্ভবত বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করে না যে আগে ঘোষণা করা হয়েছে নাকি পরে। ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের অনেক এপিডেমিওলজিস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তার আগে থেকে জানত যে আমরা একটি বড় ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছি।

স্পিয়েগেল: তার পরও ইউরোপীয় দেশগুলো বেশ চুপচাপ ছিল?

ব্রান্ডল্যান্ড: আমিও তা লক্ষ করেছি। আমি খুব অবাক হয়েছি গোটা ইউরোপে এ ঘটনায় বেশ ধীর প্রতিক্রিয়া দেখে।

স্পিয়েগেল: কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মহাদেশের সেরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মহামারীর কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ বিপর্যয় কীভাবে ঘটল?

ব্রান্ডল্যান্ড: ইউরোপও ভুল করেছে। দায়িত্বশীল অনেকেই তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতা সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং তারা নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়াবহতার বিষয়টিকে অবমূল্যায়ন করেছেন। আমার দেশ নরওয়ের দিকে তাকান। শুরুতে কর্তৃপক্ষ ভাবল তারা প্রতিটি সংক্রমণকে ট্র্যাক করতে পারবে। হঠাৎ দশটি সংক্রমণের ঘটনা সামনে এলে দেখা যায়, আমরা আসলে সংক্রমণের অজানা এক শৃঙ্খলের মুখোমুখি হয়েছি। এর পরই লকডাউনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

স্পিয়েগেল: পরবর্তী মহামারী কি আরো ভয়ংকর হবে?

ব্রান্ডল্যান্ড: দুর্ভাগ্যজনক হলেও বলতে হচ্ছে, হ্যাঁ। এমন ভাইরাস আসতে পারে যা করোনাভাইরাসের মতো সংক্রামক এবং মৃত্যুহার এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। আমাদের আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। অনেক ভালোভাবে।