মানুষের শরীরের ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব অনেক বেশি। মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ১৮০টির বেশি দেশে সংক্রমণের সংখ্যা ৪ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এই মহামারীর প্রভাব যেন আরো বেশি। একপর্যায়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। এর অর্থ ২.৬ বিলিয়ন মানুষকে করোনাভাইরাসের আবেগিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলসের হেলথ সাইকোলজিস্ট ইলকে ভ্যান হোফ বলেন, এ লকডাউন তর্কযোগ্যভাবে এখন পর্যন্ত পরিচালিত বৃহত্তম মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। এই অযাচিত পরীক্ষার ফলাফল মাত্রই গণনা করা শুরু হয়েছে।

সহনশীলতার বিজ্ঞান যা কিনা প্রতিকূল অবস্থায় মানুষের আচরণ সম্পর্কে কিছু ধারণা প্রদান করে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির জর্জ ভ্যাইলান্ট বলেন, যখন কোনো ডালকে তার আকারের বাইরে বাঁকানো হয়, এটা ভেঙে যাওয়ার বদলে মোচড় খেয়ে পুনরায় বাড়তে শুরু করে। এই রূপকটি বর্ণনা করে সেই বিস্ময়কর সংখ্যক মানুষের, যাদের দুই-তৃতীয়াংশ কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে কোনো ধরনের মানসিক প্রভাব ছাড়াই সেরে ওঠে, এমনকি যখন তাদের সহিংস অপরাধ অথবা যুদ্ধবন্দি হিসেবে থাকতে হয় তখনো। কেউ কেউ আবার তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠে। কিন্তু অন্য একটি অংশ সত্যিকার অর্থেই মানসিক উদ্বেগে ভুগতে থাকে। যাদের কেউ হয়তো কয়েক মাস আবার কেউ কয়েক বছর।

অবশ্য কেউ যদি সহনশীলতা দেখাতেও পারে তবুও কভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট মানসিক সমস্যাকে সুনামির সঙ্গে তুলনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এখানে মানুষ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। যার মাঝে রোগাক্রান্ত হওয়ার হুমকি, আইসোলেশনের কারণে সৃষ্ট একাকিত্ব, প্রিয় মানুষকে হারানো, চাকরি হারানোর ভয় এবং মহামারী শেষ হওয়া নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্য। হতাশা, উদ্বেগ ও পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসও এর ফলে দেখা দিতে থাকে। মানসিক স্বাস্থ্যের হটলাইনগুলো ফোনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলেছে এবং প্রাথমিক জরিপও বেশ উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো খবর দিচ্ছে। এই মহামারী চাপ বাড়ানোর যাবতীয় কাজ ঠিকঠাক করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মনোবিদ আনিতা ডেলংগিস। বিশেষ করে মেডিকেল ফ্রন্টলাইনার হিসেবে কাজ করা একজন পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর আত্মহত্যার ঘটনা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা কী পরিমাণ ঝুঁকির মাঝে আছি।

ব্যক্তির সহশীলনতা আরো বেশি জটিল হয়ে যাচ্ছে, কারণ মহামারী সবাইকে একইভাবে আঘাত করছে না। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ওপর করোনাভাইরাস ভিন্ন ভিন্নভাবে আঘাত করছে এবং ঠেলে দিয়েছে বিপর্যস্ত অভিজ্ঞতার ভেতরে। যেমন ব্রুকলিনের কথাই বিবেচনা করা যাক। এখানে কয়েক মাইলের মাঝে বসবাসকারী ব্যক্তিদের অসুস্থতা এবং সামাজিক দূরত্বের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ও চ্যালেঞ্জও আলাদা। ব্যক্তি, ব্যবসা এবং সংগঠনগুলো কীভাবে তাদের ক্ষতি পোষাবে তা নির্ভর করছে এটা শুরুর সময় কাজ, বীমা এবং তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন ছিল তার ওপর।

এই মহামারী আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অন্যায্যতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিন আমেরিকান মানুষেরা যেখানে সাদা আমেরিকানদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে মারা যাচ্ছে।

অভূতপূর্ব এই মহামারীটি বিজ্ঞানকে কেবল ভাইরোলজির দিক থেকেই নয়, মানসিক স্বাস্থ্য ও সহনশীলতার দিকেও অভূতপূর্বতার দিকে চালিত করেছে। আচরণ বিজ্ঞানীরা এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করছেন এবং এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে কী করা যায় তা বের করার চেষ্টা করছেন। যেখানে সহনশীলতার নতুন ধরনের বিজ্ঞানের ধারণার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যার ফলে এই শিক্ষা লাভ করা যাবে যে ঘটনা ঘটার আগেই কীভাবে সহনশীল হওয়া যায়।

রাফায়েল হাসিদ নামে এক ব্যক্তি ইসরায়েল থেকে নিউইয়র্ক আসেন ২০০০ সালে। ২০০৫ সালে ব্রুকলিনে তিনি একটা রেস্টুরেন্ট খোলেন। যা স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে হাসিদ বুঝতে পারেন কী ঘটতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি ইসরায়েলের খবরগুলো দেখছিলাম। সবদিক থেকে আমরা দুই সপ্তাহ পিছিয়ে ছিলাম। এটা এখানেও ঘটতে যাচ্ছে। তিনি রেস্টুরেন্টের সংরক্ষণযোগ্য নয় এমন খাবারগুলো প্রতিবেশীদের দিয়ে দেন। এর মাঝেই শহরের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং সে ধারাবাহিকতায় হাসিদের রেস্টুরেন্ট মারিয়ামও বন্ধ হয়ে যায়।

এই ধরনের ট্রমাটিক ঘটনা অনেক ঘটেছে। সাইকোলজিস্ট জর্জ বোনানো বলেন, ৬৫ শতাংশ মানুষ ন্যূনতম মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখাতে চলেছে। বোনানো এর আগে ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের পর তার প্রভাব নিয়েও কাজ করেছিলেন। তিনি এবং অন্যদের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে তীব্র কষ্টের তিনটি সাধারণ সাইকোলজিক্যাল প্রতিক্রিয়ার কথা বলে। যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ লোক সহনশীলতার পথ অনুসরণ করে এবং তুলনামূলকভাবে মানসিক ও শারীরিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। ২৫ শতাংশ লোক হতাশা অথবা পোস্ট ট্রমাটিক উদ্বেগের মতো সাময়িক মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং ১০ শতাংশ লোক স্থায়ী মানসিক সমস্যায় ভোগে। এই ফল বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং আর্থসামাজিক অবস্থার মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি। বোনানো বলেন, আমরা সবার কথাই বলছি। বিপরীতে, মানসিক সমস্যার ঝুঁকি নিম্ন আয়ের লোকদের ক্ষেত্রে আবার দ্বিগুণ।

গবেষণা বলছে, কঠোর কোয়ারেন্টিন পদ্ধতি নেতিবাচক মানসিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গোটা দুনিয়া এর আগে কখনো একসঙ্গে এভাবে লডকাউন হয়ে পড়েনি। বোনানো বলেন, ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন আর কখনো চলেনি। আমরা আসলেই জানি না কীভাবে মানুষ এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ন্যান্সি সিন বলেন, এটি অন্য উদ্বেগের চেয়ে ভিন্ন। কারণ এটা কেবল জীবনের একটি মাত্র দিক নয়। মানুষ এখন পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক এবং কাজের দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতেও পরিষ্কার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যেখানে প্রথম কভিড-১৯ আঘাত হেনেছিল সেই চীনে বিস্তৃত এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ লোক মানসিক সমস্যায় ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রে যারা এমনিতেই উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগে তাদের সেই উদ্বেগ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ উদ্বেগ সামলানোর ক্ষেত্রে তরুণদের চেয়ে বয়স্ক লোকদের সক্ষমতা বেশি বলেও জানিয়েছেন সিন। তবে যতই দিন যাচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা প্রতিনিয়ত অবনতির দিকেই যাচ্ছে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত