করোনাভাইরাসের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তনের ছোঁয়া, যার প্রভাব দেখা যাবে আগামী দিনগুলোতে। বাংলাদেশও এ পরিবর্তনের বাইরে নয়। করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা কেমন হতে পারে—
গ্রাম অঞ্চলে বাড়তে পারে জনসংখ্যা
ঘরে বন্দি থাকার কারণে বাড়তে পারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, বিশেষ করে গ্রামবাংলায়। কাজ ও বিনোদনের সুযোগ কম থাকায় পরিবারকে আগের তুলনায় এখন সবাই বেশি সময় দিচ্ছে। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, তারা অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাদ্য বা খাবার সহায়তা পাচ্ছে—এই দুটি কারণ হতে পারে গ্রামবাংলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকারের উচিত এ সময়ে গ্রাম অঞ্চলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে জোর দেয়া। অন্যথায় অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি হতে পারে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিষফোড়া।
সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চুরি-ছিনতাই ইত্যাদি বাড়বে
এরই মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি লকডাইনের কারণে উন্নত দেশসহ অনুন্নত দেশ—সব জায়গায় কম-বেশি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চুরি-ছিনতাই ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ। এর অন্যতম কারণ হিসেবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে সামাজিক দূরত্ব কার্যক্রমে জোর দেয়া। তাই আমাদের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত হবে এসব বিষয় মাথায় রেখে সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে আগে থেকেই শহর, গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল, চর, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
পারিবারিক নির্যাতন
আমরা এরই মধ্যে সবাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পারিবারিক নির্যাতনের হার বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। যদিও বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো গবেষণা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ পায়নি। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঘরে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় দেয়ার কারণে এবং কাজ না থাকার কারণে বা অতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নির্ভর হওয়ার কারণে পারিবারিক নির্যাতন বাড়তে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেকে যতদূর সম্ভব শান্ত রাখা এবং একে অন্যের ছোট ছোট দোষ-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা।
শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়বে
করোনা-পরবর্তী সময়ে গ্রামবাংলায় বা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে রোপণ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত অমূল পরিবর্তন আসবে। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অর্থাৎ কৃষিকাজে সরাসরি মানুষের পরিবর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য কাজ করছে। এর ফলে কৃষিকাজে তুলনামূলক কম লোকের প্রয়োজন হবে, যার বড় একটা অংশ চেষ্টা করবে শহরমুখী হওয়ার। এর বড় একটা অংশ জড়িয়ে পড়তে পারে ভিক্ষাবৃত্তিসহ অসামাজিক কাজে। তাই সরকারের এখনই উচিত হবে গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করা।
শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন
উন্নত বিশ্ব এরই মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় অমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রমে তারা ব্যবহার করতে শুরু করেছে অনলাইন বা ডিজিটাল প্লাটফর্ম। একটা জরিপে দেখা যায়, উন্নত বিশ্ব সামাজিক মাধ্যম জুম অ্যাপ ব্যবহার করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে। আমাদের সরকার এরই মধ্যে টেলিভিশন, বিশেষ করে সংসদ টিভির মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। যেহেতু আমাদের সরকার এরই মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে এবং যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তাই আমাদের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের উচিত হবে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আরো জোর দিয়ে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় অ্যাপ ও সফটওয়্যার বানানো; যাতে এ আপত্কালে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ট্যুরিজম ও ভ্রমণের পরিবর্তন
এ রোগের টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে এ খাতের। সাধারণ মানুষ চাইবে কম জনসম্মুখে যাওয়ার জন্য, নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কেউ হয়তোবা বাড়ির বাইরে অবস্থান করবে না। আবাসিক হোটেলগুলোর মন্দা ভাব থাকতে পারে কমপক্ষে আগামী এক বছর। এ কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভালোমানের হোটেলগুলো। কারণ আগামীতে ব্যবসায় টিকে
থাকতে তাদের গুনতে হবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উচ্চ বেতন। তবে ছোট বা মোটামুটি মানের হোটেলগুলোর যেহেতু অপারেশন খরচ কম, তাই তারা এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে আমাদের শহরগুলোতে যে খাবার হোটেলগুলো রয়েছে তাদেরও যুদ্ধ করতে হবে টিকে থাকার জন্য। কারণ সবাই চাইবে হোটেলের খাবার না খাওয়ার জন্য। তবে অনলাইনের খাবারগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা হলেও শহরের হোটেলগুলো ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
বেকারত্ব নাও বাড়তে পারে?
উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি আর আমাদের অর্থনীতির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। আমাদের দেশ অনেকটা শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে উন্নত বিশ্ব প্রায় সবাই সার্ভিস সেক্টরের সঙ্গে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর অনেকটাই শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। চীন গার্মেন্টসে শীর্ষত্ব ধরে রেখেছে প্রায় ৭০ বছর ধরে। এ শিল্পে চীনের ধারেকাছে কেউ নেই। যদিও বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, কিন্তু পার্থক্য আকাশ-পাতাল। অনেকে মনে করছে, এ পার্থক্য অনেকটা কমে আসবে। কারণ চীনের কারণে গার্মেন্টসের বড় ক্রেতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর তাই তারা এরই মধ্যে চায়নার অনেক ক্রয় আদেশ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তর করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের উচিত এ সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করা। এর ফলে বাংলাদেশের লাভ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার যে আশঙ্কা রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে এ খাত বড় ভূমিকা রাখবে।
বিনিয়োগ বাড়বে
চায়নায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের যে বিনিয়োগ রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়, বিশেষ করে বাংলাদেশে একটা বড় অংশের বিনিয়োগ চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ইকোনমিক জোনগুলো এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সরকারের উচিত এ বিনিয়োগ আকর্ষণে পলিসি তৈরি করে বেজাকে আরো সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনে বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে বিনিয়োগ আকর্ষণে বেজার সঙ্গে একত্রে কাজ করা উচিত। আমরা এরই মধ্যে জেনেছি জাপান সরকার চায়না থেকে তাদের শিল্প স্থানান্তরে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানিজ বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথক ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে, যার ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে জাপানের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশনকে।
আমাদের উচিত এ মহামারী চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে গোটা জাতি একত্র হয়ে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা, যাতে আমরা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের যে অগ্রযাত্রার দিকে যাচ্ছিলাম তা ধরে রেখে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হই।
মো. আব্দুল কাদের খান: উন্নয়নকর্মী ও পরামর্শক, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)





