এই মার্চে কভিড-১৯ দ্রুতগতিতে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে আমেরিকানদের জীবনও ব্যাপকভাবে ওলটপালট হয়েছে। দেশটি বেশ বাজেভাবে ভেন্টিলেটরের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মারাত্মকভাবে অসুস্থদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ শ্বাস-প্রশ্বাসের মেশিনও ছিল না। এর প্রতিক্রিয়ায় এপ্রিলে মার্কিন সরকার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয় ১ লাখ ৩৫ হাজার ভেন্টিলেটর তৈরির জন্য।
কিন্তু বসন্তের মধ্যে অতিরিক্ত ভেন্টিলেটরগুলো হাতে থাকলেও একদল মেডিকেল বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, মেশিন সম্ভবত টিকে থাকার হারকে অর্থপূর্ণভাবে উন্নত করতে পারে না। কারণ একবার কোনো রোগী যদি এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে যে ওগুলোর প্রয়োজন পড়ে তখন অনেকেই যেকোনোভাবেই মারা যায়। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেন্টিলেটরের ওপর জোর দেয়া শারীরিক দূরত্ব, মাস্ক ও হাত ধোয়ার মতো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলোকে প্রচার ও অর্থের দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছিল। যদি তা আরো আগে থেকে করা হতো তবে আরো অনেক বেশি জীবন বাঁচানো যেত। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার এপিডেমিওলজিস্ট স্কট হালপের্ন বলেন, সেই ৩ বিলিয়ন ডলার সম্পূর্ণরূপে প্রশ্নাতীতভাবে নষ্ট করা হয়েছে।
তার মতে, ভেন্টিলেটরের ওপর মনোযোগ দেয়া ‘সংকটের সঙ্গে কীভাবে লড়াই করতে হবে তার মায়োপিক চিন্তার’
একটি ব্যয়বহুল উদাহরণ। মহামারীর শুরুতে প্রচণ্ড অনিশ্চয়তার মাঝে স্বাস্থ্য এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের জন্য রোগীদের চিকিৎসার অগ্রাধিকার ঠিক করা কঠিন ছিল। ব্যয়বহুল শ্বাস-প্রশ্বাসের সরঞ্জামের অভাব তাদের সাধারণ সমাধানগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
ভেন্টিলেটরের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করা অবশ্য পুরোপুরিভাবে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল না। এটি কিছু মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাতিত্বকে প্রতিফলিত করে, যা আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ উদারপন্থী, রক্ষণশীল, নির্বাচিত কর্তা, রোগী, পরিবারের সদস্য ও ডাক্তাররা নির্ধারণ করে কী গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ফলস্বরূপ আমরা কী সিদ্ধান্ত নিই তা। মানুষের প্রবণতাই হচ্ছে বর্তমানকে ভবিষ্যতের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া। আমাদের জন্য কল্পনা করা সহজ তাকে রুখতে চাই—ইমার্জেন্সি রুমে ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনে মৃত্যু। এছাড়া সর্বাধিক আশাবাদী ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়ার প্রবণতা আমাদের আছে এবং তার ফলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির চেয়ে ভালো অবস্থার জন্য প্রস্তুত হওয়া যায়। হালপের্ন বলেন, কিছু রাজনীতিবিদের বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যানের যে অভ্যাস তা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলেছে। আসল ব্যাপার হলো এটা ছাড়াও পক্ষাপতিত্ব বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এটাকে না বুঝে ভালো নীতি নির্ধারণ করা এবং জনসাধারণের কাছে কার্যকর বার্তা দেয়া কঠিন।
আমাদের অনেক জ্ঞানতাত্ত্বিক পক্ষপাতিত্ব হাজার বছরের অভিযোজনের ফল। প্রকৃত বিশ্বাস টিকে থাকার জন্য সহযোগিতা ও প্ররোচিত করার চেয়ে কমই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্বাসগুলো আত্মরক্ষামূলকই হয়ে থাকে। আশাবাদী পক্ষপাত
একটি উপযুক্ত উদাহরণ। হালপের্ন বলেন, আইসিওতে থাকা রোগীদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে থাকা আশার শক্তি এবং আশা, সেই আশা বাস্তবায়ন না হলেও শক্তিশালী ও স্ব-সংরক্ষণযোগ্য। আইসিও ডাক্তার হিসেবে আমরা রোগীর পরিবারকে সেরাটা প্রত্যাশা করতে বলি, কিন্তু প্রস্তুত হতে বলি একদম খারাপ কিছুর জন্য। এটা মনে হচ্ছে, এই নির্দেশনা মহামারীর সময় আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন।
এখানে কিছু মানসিক ধাক্কাও আছে যা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ডাচ রাজনৈতিক মনোবিদ জরিস ল্যামারস এর আগে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেছেন। যেখানে তিনি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধি বুঝতে মানুষের অক্ষমতার কথা বলেন। জুনে ল্যামার ও তার সহকর্মীরা তিনটি গবেষণার একটি সেট প্রকাশ করেন, যেখানে তারা মহামারীর ক্ষেত্রে একই সমস্যা দেখান।
রৈখিক ও তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধির ফলাফলের মাঝে সে বিশাল পার্থক্য তা স্পষ্ট। ল্যামারস বলেন, কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ বৃদ্ধি মানে যদি আমরা কিছু না করি এবং এটা যদি এই গতিতে বাড়তে থাকে তবে একপর্যায়ে তা অর্ধেক জনসংখ্যাকে আক্রান্ত করবে।
আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব একটা আরেকটাকে ছেদ করে। ল্যামারস বলেন, মানুষ পক্ষপাতিত্বের প্রতি বেশি সংবেদনশীল যদি তারা নিজেদের রাজনৈতিক আখ্যানে ফিট হয়।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের একজন ক্যারোলিন হোপার বলেন, কভিড-১৯ কে ঘিরে তৈরি হওয়া ‘টেনশন পয়েন্ট’
হলো স্বাধীনতা ও সম্মিলিত দায়িত্বের মাঝে ভারসাম্য। নেতারা পারেন সব ধরনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে একটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে। হালপের্ন আশা করেন, আমাদের চিহ্নিত করার ব্যর্থতা এবং মহামারীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পক্ষপাতিত্ব থেকে আমরা শিক্ষা নেব। যা আমাদের ভবিষ্যতে সাহায্য করবে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





