করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি/লকডাউনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এর ফলে একদিকে যেমন বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই ব্যক্তির কর্মসংস্থান ও খানার আয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দেশের সার্বিক দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের ৮৫ শতাংশ শ্রমিকই যেহেতু অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব কাজ অস্থিতিশীল, নিম্ন মজুরির, চুক্তিবিহীন এবং এদের একটি অংশ আবার দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল), চলমান এই লকডাউন/ছুটির কারণে, এদের অনেকেরই কাজ হারানো বা আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এদের অনেকে যারা এই বিপর্যয়ের আগে দরিদ্র ছিলেন না, তারা হয়ে যেতে পারেন দরিদ্র। তবে বলাই বাহুল্য যে খানাভিত্তিক দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে সংক্রমণের স্থায়িত্বকাল, ব্যাপ্তি এবং এক্ষেত্রে সরকার গৃহীত কর্মসূচির দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের খানা জরিপ অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪.৩ শতাংশ (উচ্চ দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী) এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশ (নিম্ন দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী), যা কিনা পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে এসে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২০.৫ ও ১০.৫ শতাংশ (বিবিএস)। তবে এই দরিদ্র ও অতিদরিদ্র ছাড়াও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি একটি বিশাল আকারের জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ভঙ্গুর (ভালনারেবল)/ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বলা চলে, কারণ যেকোনো অর্থনৈতিক/প্রাকৃতিক সংকট তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে। কভিড-১৯ কে যদি আমরা একটি অর্থনৈতিক সংকট/শক হিসেবে ধরে নিই, যা খানা সদস্যদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে এ ধরনের বিপর্যয়ের ফলে এ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ‘নতুন দরিদ্র’ হয়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান বা আয়ের নতুন উৎস তৈরি হওয়ার ফলে দরিদ্র খানাগুলোর একটি অংশের দারিদ্র্যসীমার ওপরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এ ধরনের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই বললেই চলে। তাই কভিড-১৯-এর প্রভাবে সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দারিদ্র্য ঝুঁকির মধ্যে থাকা এ জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা/ শতকরা হার খানা জরিপগুলোতে সরাসরিভাবে না থাকলেও ২০১৬ সালের খানা জরিপের উপাত্ত ব্যবহার করে গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমানে দরিদ্র নয় কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের (শক) ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে (অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ) এমন খানা রয়েছে ১৫.২ শতাংশ, এদের মধ্যে আবার ৬.২ শতাংশের ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি (অর্থনৈতিকভাবে অতিভঙ্গুর/ঝুঁকিপূর্ণ) (লেখকের চলমান গবেষণার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী)। শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে এই নতুন দরিদ্র খানা যথাক্রমে ১৩.৬ ও ১৫.৮ শতাংশ। তাই গ্রামের তুলনায় শহরের অধিবাসীদের ঝুঁকি সামান্য বেশি, যার একটি কারণ শহরাঞ্চলের বস্তিগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থা ও কাজের অস্থিতিশীলতা। এছাড়া, প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ যেমন পার্বত্য ও চর এলাকার (কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা) মানুষের অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বেশি।

এ গবেষণায় খানাভিত্তিক বিভিন্ন চলকের সাপেক্ষে একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকির সূচকের মাধ্যমে আরো দেখা গেছে যে কিছু কিছু পেশা এক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন প্রাথমিক খাত (এলিমেন্টারি পেশা), যার মধ্যে রয়েছে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নিম্ন মজুরির অনানুষ্ঠানিক গার্মেন্টস শ্রমিক। এ খাতের ২৩ শতাংশ শ্রমিক যারা আগে দরিদ্র ছিলেন না, তারা অর্থনৈতিক শক যেমন করোনাভাইরাসের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন। এ হার কৃষি খাতের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ, মেশিন অপারেটর যেমন কলকারখানার শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকের ক্ষেত্রে ১৫.৪ শতাংশ, স্বল্প দক্ষতার ক্র্যাফটস ও বাণিজ্যিক শ্রমিক যেমন অপেক্ষাকৃত দক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, দর্জি এ ধরনের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ১৩.৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ক্ষেত্রে ১২.৪ শতাংশ। সার্বিকভাবে দারিদ্রসীমার নিচে নতুন করে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা, কর্মচারী/এমপ্লয়ি (৭ শতাংশ) ও নিয়োগকর্তার/এমপ্লয়ারের (৭ শতাংশ) চেয়ে বেশি দিনমজুর (২৪.৬ শতাংশ) এবং স্বনিয়োজিত কাজে (১৬.৬ শতাংশ) যারা আছেন তাদের।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এই নতুন দরিদ্রদেরও সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে আনার দরকার হবে। এছাড়া এনএসএসএসের (জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয় কর্মসূচি) দ্রুত বাস্তবায়ন কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, রেজিস্ট্রেশন না থাকার কারণে সরকারি প্রণোদনার সুযোগ নেয়া জটিল হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে শিল্প খাত/এলাকাভিত্তিক সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নিজ নিজ সমস্যা জানানো ও সহায়তার আবেদন (সেলফ ক্লেইম) করার জন্য টেলিফোন ও অনলাইন সুবিধার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পরবর্তী বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য দরকার বিশেষ শুল্ক ছাড় ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক মন্দার কারণে তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসী আয়ের সংকোচন ও অভিবাসী শ্রমিকদের ফেরত আসার সম্ভাবনা সার্বিকভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ স্বল্পমেয়াদে শ্লথ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন সহজ হবে না। সরকারের তরফ থেকে এর মধ্যে আমরা বেশকিছু প্রণোদনার ঘোষণা দেখেছি, যা সাময়িকভাবে এই দরিদ্র/ নতুন দরিদ্রদের খাবারের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে। তবে এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া ও এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তবে শুধু আপত্কালীন জরুরি সহায়তা নয়, বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে তাই শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও দক্ষতার সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। 

লেখক:

ড. সায়মা হক বিদিশা, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তানভীর মাহমুদ, গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান

মো. বিপ্লব হোসেন, এমএসএস, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়