করোনাভাইরাস মহামারীর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কভিড-১৯ আক্রান্ত কিছু রোগী কেন ও কীভাবে সংক্রমণ থেকে সেরে উঠছে এবং কিছু রোগীর অবস্থা কেন খারাপ হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের কাছে এ প্রশ্নের এখনো নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। তবে হাসপাতালে ভর্তি ২২ জন রোগীর ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় এ-সংক্রান্ত কিছু সূত্র পাওয়া গিয়েছে।
গবেষকরা লিখেছেন, রোগীদের অ্যান্টিবডির বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতাগুলোর একটি বিস্তৃত গণনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা রোগীদের বেঁচে থাকা এবং মারা যাওয়াদের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করেছেন। উল্লেখ্য, বেঁচে যাওয়া রোগীদের মধ্যে সার্স-কোভ-২ স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়াগুলো শক্তিশালী ছিল, অন্যদিকে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ভাইরাসের নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনকে লক্ষ্য করে অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়াগুলো বেশি ছিল। অনুসন্ধানগুলো গত ৩০ জুলাই ইমিউনিটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।
গবেষণাটিতে জড়িত নন এমন একজন, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট বালি পুলেন্দ্রন বলেছেন, যদিও এটা স্পষ্ট নয় যে বিভিন্ন অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া রোগীদের বিভিন্ন রোগের ট্র্যাজেক্টোরিজের কারণে কিনা। তবে গবেষণাটি সার্স-কোভ-২-এর প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভের সুযোগ করে দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সিয়াটলের নার্সিং হোমগুলোর মাধ্যমে কভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও ইমিউনোলজিস্ট হেলেন চু হারবারভিউ মেডিকেল সেন্টারে কিছু রোগী দেখেছিলেন। চু বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন যে নির্দিষ্ট কিছু কভিড রোগী যাদের প্রথমে দেখে সুস্থ মনে হয়েছিল কিন্তু দ্রুতই তাদের অনেকের অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং মারাও যায়।
র্যাগন ইনস্টিটিউটের গ্যালিট অ্যাল্টার বলেন, মারা যাওয়া রোগীদের চেয়ে বেঁচে যাওয়া রোগীদের শরীরে সত্যিই আলাদা ধরনের কার্যকারিতা দেখা গেছে। তারা কেবল তাদের অ্যান্টিবডিগুলোকে আলাদা উপায়ে ব্যবহার করেছেন।
উত্তরের সন্ধানে চু ও তার সহকর্মীরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২২ রোগীর থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাদের অ্যাল্টারের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তারা অ্যান্টিবডিগুলোর বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করতে পরীক্ষামূলক কৌশলগুলোর সংমিশ্রণ করে গণনামূলক পদ্ধতিতে বিবেচনা করেন। এইচআইভি, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়াসহ ভাইরাল সংক্রমণের আগের গবেষণাগুলো থেকে অ্যাল্টার শিখেছেন, ইমিউনিটির ভবিষ্যদ্বাণী করতে অ্যান্টিবডির পরিমাণ নয়, বরং তাদের বিভিন্ন কার্যকারিতা ও গুণ এবং তারা কীভাবে দলগতভাবে কাজ করে তার ওপর নির্ভর করে।
অ্যাল্টার ও তার সহকর্মীরা ২২ রোগীর অ্যান্টিবডিগুলোকে প্রোফাইল করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিল কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ১২ জন এবং মারা যাওয়া ১০ জন। বিজ্ঞানীরা সার্স-কোভ-২ নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডিগুলোর দিকে মনোনিবেশ করেছেন, যা ভাইরাসটির মূল প্রোটিনগুলোকে নিশানা করে। এখানে স্পাইক প্রোটিন, যা এটি মানুষের কোষে প্রবেশের জন্য ব্যবহার করে এবং নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন, যা তার জিনগত উপাদানকে ঘিরে রাখে। প্রতিটি ভাইরাল টার্গেটের জন্য গবেষকরা অ্যান্টিবডি বৈশিষ্ট্যগুলোর নির্দিষ্ট পরিসীমা নথিভুক্ত করেন।
গবেষক দলটির সদস্যরা বেঁচে যাওয়া এবং মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে অ্যান্টিবডিগুলোর সামগ্রিক পরিমাণ এবং অ্যান্টিবডিগুলোর সামগ্রিক সক্ষমতার কোনো পার্থক্য পাননি। দলটি যখন দুই দলের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণের জন্য গণনাপদ্ধতি ব্যবহার করেছিল, তখন তারা পাঁচটি অ্যান্টিবডি বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখতে পায়। মোটাদাগে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের স্পাইক প্রোটিনের অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল, অন্যদিকে যারা মারা গিয়েছিল তাদের মধ্যে অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়াগুলো নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিনের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল।
গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এ আবিষ্কার কভিড রোগীদের অসুস্থতার ভবিষ্যৎ প্রাথমিক সময়েই নির্ণয় করতে সহায়ক হবে। এবং এর ওপর ভিত্তি করে আগেভাগেই রোগীর যত্ন ও চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
দ্য সায়েন্টিস্ট





