গত ২৯ মে মধ্যরাতে ব্রায়ান ইনগানগা একজন ধাত্রীর কাছ থেকে ফোন পেলেন। ধাত্রী তাকে বললেন, আপনাকে দ্রুত আসতে হবে। ৩১ বছর বয়সী এ ফটোগ্রাফার দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে নাইরোবির একটি বস্তি কিবেরার দিকে গেলেন। বস্তিটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বলেই কেবল ইনগানগা উদ্বিগ্ন ছিলেন এমন নয়, কারফিউর পর পুলিশও খুব আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল।
ধাত্রী তাকে রাস্তা থেকে তুলে নিলেন এবং একটি সরু গলির ভেতর দিয়ে একটি বাসায় নিয়ে গেলেন। যেখানে ছোট একটি ঘরের ফ্লোরে শুয়ে ছিলেন ভেরোনিকা অ্যাতিয়েনো। পরের এক ঘণ্টায় মায়ের সন্তান জন্ম দেয়ার বেশকিছু ছবি তোলেন ইনগানগা। সেখানে কোনো ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী ছিল না। ধাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া হারবাল মিশ্রণই ছিল ভরসা। ইনগানগা বলেন, এটি বেশ ধাক্কা দেয়ার মতো অভিজ্ঞতা ছিল। আমাদের নারীরা সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য হাসপাতালে যেতে পারছে না। তারা ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে একটি নোংরা ফ্লোরে শুয়ে আছে।
ইনগানগা সন্তান জন্ম দেয়ার এমন রূপটি ধরে রাখতে চাইলেন কারণ তিনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি নিজে বেড়ে উঠেছেন কিবেরাতে এবং জানেন যে বস্তিতে বসবাসের অর্থ আসলে কী! তার মতে, এখানে কেবল দারিদ্র্য ও বিপদ। আর এখন সবকিছু আরো কঠিন। করোনা সংকট নারীদের জন্য হুমকি হয়ে এসেছে। অনেকেই তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভধারণ করছেন, কারণ গর্ভনিরোধ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নারীরা অনেকেই ভয়ানক বিপদের মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি বদলানোর মতো কেউই নেই।
এমনকি মহামারীর আগেও মাতৃত্বকালীন মৃত্যুতে কেনিয়া ছিল শীর্ষ দেশগুলোর একটি। যদিও এখন পর্যন্ত ২০২০ সালে কী হয়েছে তা নিয়ে তেমন কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যান হাতে নেই। তবে বিশেষজ্ঞ ও সহায়তা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে যে সন্তান জন্ম দেয়ার পরপর কিংবা কিছুটা সময় পর মা ও শিশুর মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটা কেনিয়ায়ই নয়, গোটা বিশ্বেই বেড়েছে।
১১৮টি দেশে গাণিতিক মডেলিংয়ের ওপর ভিত্তি করে করা জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা বলছে, ২০২০ সালে মহামারীর কারণে বাড়তি ১০ লাখ শিশু এবং ৫৬ হাজার ৭০০ জন মায়ের মৃত্যু দেখা যেতে পারে। সেভ দ্য চিলড্রেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রেবেকা ফ্রিক বলেন, এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া কঠিন। মা ও শিশুর মৃত্যুতে মহামারীর প্রভাব সামনের কয়েক বছর পর স্পষ্টভাবে পাওয়া সম্ভব হবে।
সন্তান জন্মদানের ওপর লকডাউনের প্রভাব নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গবেষণায় একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী নেপালের নয়টি হাসপাতালের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখেছেন। সেখানে তারা যা দেখেছেন তা হলো, দেশের লকডাউন হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেয়ার হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি মাতৃগর্ভে এবং জন্মের পরপর মৃত্যুর হার একই সময়ের মধ্যে প্রায় সমপরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্য দেশগুলোতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্রিক বলেন, এ বিষয়টি আমাদের জন্য উদ্বেগের চেয়ে বেশি কিছু বয়ে নিয়ে এসেছে।
এক রাতে সাত শিশুর মৃত্যু
আফ্রিকার কিছু দেশের মেডিকেল বিশেষজ্ঞরাও এরই মধ্যে সতর্কসংকেত দিয়েছেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারেতে জন্মের সময় এক রাতে সাতটি শিশু মৃত্যুবরণ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডাক্তার বিবিসিকে জানান, পোর্ট এলিজাবেথের গিনজা হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ড উপচে পড়েছে। যেখানে অনেক মা ও শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। এসব ঘটনায় হাসপাতাল কর্মীরাও মুষড়ে পড়েছেন।
দুটি দেশেই মৃত্যুর জন্য আংশিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে হাসপাতালে কর্মী সংকটকে। হাসপাতালের বেশির ভাগ কর্মীকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে কভিড-১৯-এর রোগীদের ওপর। আবার কোথাও কোথাও কর্মীরা নিজেরাই সংক্রমিত হয়ে পড়েছেন। কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতাল কর্মীরা প্রয়োজনীয় সংস্থানের জন্য আন্দোলন করছেন। জীবাণুনাশক ও ওষুধের স্বল্পতা দেখা গিয়েছিল। কখনো কখনো গর্ভবতী নারীকে জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য কয়েকদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। জরুরি অবস্থা কিংবা প্রসবকালে প্রত্যাশিত সহায়তার কিছুই তারা লাভ করেনি।
কেনিয়ায় কর্মরত ৩২ বছর বয়সী এনজিও কর্মী এমা ইনগাইজা বলেন, মহামারীর ফলাফল ভয়াবহ। তিনি মহামারীর শুরু থেকেই একটানা কাজ করে যাচ্ছেন। গর্ভবতী নারীসহ সবাইকে সাহায্য করছেন। ইনগাইজা নিজেও গর্ভাবস্থায় মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক খবর পড়েছেন। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সবাই খুবই আতঙ্কিত। সব সংস্থান এবং মেডিকেল কর্মী এখন কভিড-১৯-এর ওপর মনোযোগ দিয়েছে। যে কারণে গর্ভবতী নারী, মা ও শিশুরা ভোগান্তিতে আছে।
তার মতে, কেনিয়ায় মহামারীর আগে কোনো কোনো হাসপাতালে প্রতি রাতে প্রায় ৩০টি শিশু জন্মগ্রহণ করত। কিন্তু নানা সংকটে তা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারফিউ বলবৎ করতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের ভয়েও অনেকে ঘর থেকে বেরুতে ভয় পাচ্ছে।
এমনকি নারীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাইরে বেরিয়েও অনেকে মারধরের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন ইনগানগা। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ঘরে সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ভালো পরিস্থিতি হচ্ছে ধাত্রীর উপস্থিতি। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে ধাত্রীরাও নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে পারছেন না।
ইনগানগা বলেন, তারা প্রসূতিদের যত্ন নিতে চাইলেও পারছেন না। দেখা যায়, তাদের কেবল এক জোড়া গ্লাভস রয়েছে। তারা আসলে কীই-বা করতে পারে।
হাসপাতালেই মা ও শিশুরা ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে
আরেকটি বাড়তি সমস্যা হচ্ছে, সন্তান জন্ম দেয়ার আগে ও পরের হেলথ চেকআপ। রেবেকা ফ্রিক বলেন, অনেক দেশে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে নারীরা আর হাসপাতালে আসছেন না। তারা শুনছেন, অনেক মানুষ এখানে মারা যাচ্ছে। তারা তাই নিজেদের ও শিশুদের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে চান।
হিল্ডা আরগুয়েলো আভেনডানো নামে এক ডাক্তার বলেন, মেক্সিকোতেও এ ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। যেখানে ভয়ের কারণে নারীরা হাসপাতালকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন। সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন মতে, ওয়াক্সকাতে সদ্য ভূমিষ্ঠ চার শিশুসহ মোট আটজন সংক্রমিত হয়েছে।
তিনি বলেন, মেক্সিকোতে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর প্রাথমিক একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মহামারী। যেখানে মায়েদের মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। মেক্সিকোতে আগস্টের শুরুতে ৯৭ জন নারী হয় গর্ভাবস্থায় নয়তো সন্তান জন্ম দেয়ার অল্প সময় পর করোনায় সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ডার স্পিয়েগেল থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত





