কথায় আছে, পরিবর্তনই হচ্ছে জীবনের একমাত্র ধ্রুব বিষয়। কভিড-১৯-এর মহামারীতে এর চেয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু আর নেই। বিশ্বজুড়ে এখন যে সমাজচিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন। চিন্তা, কাজ ও সামাজিক আচরণের যে পদ্ধতি তা এখন আমূল বদলে গেছে। এটি যে কেবল একটি সমাজের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বদল আনছে তা নয়, এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক জীবনেও পরিবর্তন নিয়ে আসছে।

কভিড-১৯-এর কোনো ধরনের কার্যকর ওষুধ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় এই মহামারী থামানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে এর থেকে যতসম্ভব দূরে থাকা। যাকে বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, একজনকে আরেকজনের সঙ্গে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাদের বক্তব্যে সামাজিক দূরত্বের ওপর জোর দিয়েছে। তারা বলেছে, সামাজিক দূরত্ব, টেস্টিং ও কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং আইসোলেশনের সমন্বয় করোনাভাইরাসের গতিরোধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিষ্কারভাবেই সামাজিক দূরত্ব প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো। যদিও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার এই যে উপায় তার জন্য কিছু মূল্যও দিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে কভিড-১৯ সংক্রান্ত লকডাউনের জন্য অনেক দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ স্বীকার করে নিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষ এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাইরাসের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা এবং পরিবারের সদস্য ও নিজেদের আকস্মিক মৃত্যুবরণ করার ভয়ও।

অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের ওপর এখন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা ও যন্ত্রণাও বেড়ে চলেছে। কভিড-১৯ মহামারী এখন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে ভয়ানক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। নতুন এই সংকট উদ্বেগ ও হতাশাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার বিস্তৃত রূপকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি গবেষণার জন্য করা জরিপে অংশ নেয়া মানুষের এক-তৃতীয়াংশ মহামারীর কারণে বিভিন্ন মাত্রায় মানসিক উদ্বেগের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন।

এমনকি কভিড-১৯ মহামারীর আগে মানুষের জীবন স্থবির হয়ে ছিল শিল্পায়ন, দূষণ ও দ্রুত জীবনযাত্রার ফাঁদে পড়ে। যা কিনা একাকিত্বসহ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে হুমকিতে ঠেলে দিয়েছিল। এই অসুস্থতাও মহামারীর মতো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন ভারতের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দ্য বার্ডেন অব মেন্টাল ডিসঅর্ডারস অ্যাক্রস দ্য স্টেট ইন ইন্ডিয়া: দ্য গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডি ১৯৯০-২০১৭’। যেখানে লেখক দাবি করেছিলেন ভারতে প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন মানুষ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। যেখানে ৪৫.৭ মিলিয়ন লোকের হতাশাজনিত ডিসঅর্ডারের কথা বলা হচ্ছিল এবং ৪৪.৯ মিলিয়ন লোক ভুগছে উদ্বিগ্নতাজনিত মানসিক সংকটে। একই ধরনের মানসিক সমস্যায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষও ভুগছে এবং এটা ধারণা করা হয় যে বর্তমানে পৃথিবীর ২৬৪ মিলিয়ন লোক হতাশায় ভুগছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই বলে সতর্ক করেছে যে মানসিক সমস্যা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকট হয়ে উঠবে। কভিড-১৯ মহামারীতে সৃষ্ট সংবেদনশীলতার কারণে মানুষ এরই মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগা শুরু করেছে। ফলে বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্যের আরো বেশি অবনতি ঘটছে। যার পেছনে মূলত কাজ করছে দীর্ঘস্থায়ী চাপ। আর এ চাপের কারণ অর্থনৈতিক ও মানসিক অশান্তি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে সেই মানুষগুলো সময়মতো থেরাপি ও চিকিৎসাও পাচ্ছে না।

একাকিত্বে ভোগা হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের আরেকটি জটিল অবস্থা। বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্ন ও একাকী হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ভারতের মতো যৌথ পরিবারের সংস্কৃতির বাহক দেশেও এখন প্রবীণ নাগরিকদের একা থাকতে হচ্ছে। কদাচিৎই নিকট আত্মীয়স্বজন তাদের সঙ্গে দেখা করছে। এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে প্রবীণরা খুব কমই ফোনে নিজেদের আত্মীয়র সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সঙ্গ দেয়ার মতোও কেউ থাকে না। আর এই একাকিত্বকে আরো বেশি তীব্র করে তুলেছে কভিড-১৯ সংক্রান্ত সামাজিক দূরত্ব।

এছাড়া সংক্রমিত হওয়া এবং করার ভয়েও এখন প্রবীণদের বাধ্য করা হচ্ছে ঘরে থাকতে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যারা সামাজিক পরিসরে স্বেচ্ছাসেবীদের যত্ন পেয়ে আসছিলেন। নিশ্চিতভাবেই একাকিত্বের এ অনুভূতি প্রবীণদের দুর্বল অংশকে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করতে তুলবে। আবার যারা মারা যাচ্ছে তাদের মাঝেও বয়স্ক লোকদের সংখ্যা বেশি, যারা কিনা ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও হার্টের সমস্যায় ভুগছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব অংশ তাই এখন মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে জীবন বাঁচানোকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। যা কিনা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষকে আরো বেশি অসহায় করে তুলেছে।

আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে অনূদিত