লিখিত যোগাযোগের সূচনা হওয়ার পর থেকে কার্ড বা চিঠির মাধ্যমে পাঠানো বার্তা হয়ে উঠেছে প্রাপকের জন্য যুগপৎ আনন্দ ও বেদনার উৎস। তবে মহামারীকালে চিঠিপত্রকে দেখা হয় বাড়তি সতর্ক চোখে। বিজ্ঞানী ও পোস্টাল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজের চিঠি কভিড-১৯ জীবানুমুক্ত করার প্রয়োজন নেই। কাগজ বা কার্ডবোর্ডে নভেল করোনাভাইরাস টিকে থাকতে পারে না।

স্মিথসোনিয়ান’স ন্যাশনাল পোস্টাল মিউজিয়ামের কিউরেটর লিওয়াইন হেইডেলবার্গ বলেন, স্বাভাবিক সময়ে চিঠিপত্রকে বেশ উষ্ণতার সঙ্গেই গ্রহণ করা হয়। কিন্তু মহামারীকালে বাইরের অন্য যেকোনো কিছুর মতো এটিকেও সন্দেহের চোখে দেখে থাকে সবাই। প্রাপকেরা মূলত এই ভেবে দুশ্চিন্তায় থাকে যে চিঠিটিও সংক্রমিত কিনা। কারণ চিঠিটি অন্য কোনো জায়গা থেকে আসছে, ফলে এর মধ্য দিয়ে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

এ উদ্বেগ সেই উনিশ শতকের মতো আজকের দিনেও সত্য। জীবাণুনাশক স্প্রে এবং পরিষ্কারক সামগ্রী আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের পোস্ট অফিস হলুদ জ্বরের মহামারী চলাকালে কেমিক্যাল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ব্যবহার করত ছিদ্রযুক্ত প্যাডেল।

ন্যাশনাল পোস্টাল মিউজিয়ামের উইলিয়াম এইচ গ্রোস স্ট্যাম্প গ্যালারিতে এ ধরনের প্যাডেল এখনো সংরক্ষিত আছে। যা কিনা আলাবামা শহরের মন্টেগোমেরি স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যবহার করত। যেটি দেখতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের চেয়ে চুল আঁচড়ানোর ব্রাশ বলেই বেশি মনে হয়। এই প্যাডেলটি ব্যবহার করা হতো হাতুড়ির মতো করে। যেখানে খামের মধ্যে অসংখ্য ছিদ্র করা হতো, যাতে করে সেটি পুরোপুরিভাবে কেমিক্যাল  দিয়ে জীবাণুমুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপটি হলো চিঠিপত্রকে জীবাণুমুক্ত করার বিষয়টি।

হলুদ জ্বর ছিল ভয়ংকর এক রোগ। যদিও অনেকেই আক্রান্ত হতো মৃদুভাবে। আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই মারা যেত। ১৭০২ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫ বার এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে। এর পরও এটিকে থামানো যাচ্ছিল না। কেউ জানত না কীভাবে এ ত্রাস আসে এবং কীভাবে ছড়ায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ম্যারিন হাসপাতাল থেকে বলা হয়, সংক্রমিত বস্তুকে স্পর্শের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে থাকে। যার ফলে এই ধারণা তৈরি হয় যে চিঠিপত্রও স্পর্শের মাধ্যমে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

এরপর প্যাডেলের মাধ্যমে সালফার ডাই-অক্সাইড অথবা ফরমালিন গ্যাস ব্যবহার করে জীবাণুমুক্তকরণের উপায় বের করা হয়। যা উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি স্বস্তিদায়ক ও বিরক্তিকর দুই অনুভূতিই তৈরি করেছিল। কারণ এতে চিঠিটিতে অসংখ্য ছিদ্র তৈরি হয় এবং কেমিক্যালের কারণে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ত।

স্মিথসোনিয়ানের প্যাডেলের ব্যবহার শুরু হয় ১৮৯৯ সাল থেকে, যখন হলুদ জ্বর একরকম দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর প্যাডেলের পেছনে একটি মশার ছবি আঁকা হয়, যখন ওয়াল্টার রিড নামে এক আর্মি সার্জন প্রমাণ করেন যে হলুদ জ্বর হয় মশাবাহিত ভাইরাসের কারণে।

হলুদ জ্বরের সঙ্গে কভিড-১৯-এর সঙ্গে একধরনের মিলও রয়েছে। হলুদ জ্বরেরও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা আসেনি। বিশেষ করে আফ্রিকার কিছু জায়গায় এবং দক্ষিণ-মধ্য আমেরিকায় এটি এখনো আঞ্চলিক মহামারী হিসেবে রয়ে গেছে। একে এড়ানো যায় আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। বিশেষ করে মশার উপদ্রবকে কমানোর মাধ্যমে। তবে সার্স-কোভ-২-এর বিপরীতে হলুদ জ্বরের ভ্যাকসিন রয়েছে।

পোস্টাল সার্ভিসগুলো উনিশ শতকের শুরুর দিকে চিঠিকে ছিদ্র করা এবং কেমিক্যাল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করার কাজ অব্যাহত রেখেছিল। চিঠি জীবাণুমুক্তকরণের এ পদ্ধতি কয়েকশ বছর ধরে চলে আসছে। যা ইউরোপে শুরু হয়েছিল তেরো শতকের দিকে এবং পরে আমেরিকান কলোনিগুলোসহ নতুন বিশ্ব একে গ্রহণ করে। মারাত্মক রোগের বিপরীতে ছিদ্রকরণ, জীবাণুমুক্তকরণ, কোয়ারেন্টিন এসব বেশকিছু ধারণা প্রচলিত হয়ে উঠেছিল।

চিঠি জীবাণুমুক্তকরণ মোটেই অযৌক্তিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। বার্তাবাহক গুটিবসন্ত দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, যা কিনা সংক্রামক এবং অনেক বস্তুতে থেকে যেতে পারে। ১৯০১ সালের একটি মেডিকেল লিটারেচার বলছে, গুটিবসন্তের দুটি পৃথক প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছিল চিঠির মাধ্যমে।

এরপর ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যানথ্রাক্স আঘাত হানে। এ সময় অ্যানথ্রাক্সবাহিত ন্যূনতম পাঁচটি খাম পাঠানো হয় রাজনীতিবিদ ও মিডিয়ার কাছে। ২২ জন আক্রান্ত হয়েছিল অ্যানথ্রাক্সে। যার মাঝে মারা যায় পাঁচজন। যেখানে মেরিল্যান্ডের দুজন পোস্টাল কর্মীও ছিলেন। কখনো কখনো চিঠিগুলো প্লাস্টিক ব্যাগে করে আসে, যা দিয়ে চিঠিগুলো জীবাণুমুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের প্রতিক্রিয়ায় ইউএসপিএস ডাকঘর ও কর্মীদের পরিচ্ছন্নতার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং এটা নিশ্চিত করেছে যে ডাক কর্মী ও বাহকেরা কাজের সময় মাস্ক পরিধান করবে। পাশাপাশি তারা নিজেদের ও গ্রাহকদের মাঝে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে। যদিও চিঠিগুলো জীবাণুমুক্তকরণের কোনো প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করেন।

অনেক আমেরিকান যদিও সন্দিহান যে চিঠিপত্র বা প্যাকেটজাত জিনিসপত্র আসলেই ভাইরাস বহন করে কিনা তা নিয়ে। মার্চের মাঝামাঝিতে করা এক গবেষণা বলছে, কার্ডবোর্ডে নভেল করোনাভাইরাস টিকে থাকতে পারে না। অন্যদিকে ব্রিটেনের মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে তিন ঘণ্টা পর ছাপা কাগজ এবং টিস্যু পেপার থেকে কোনো ভাইরাস উদ্ধার করা যায়নি। যদিও টাকার কাগজ ভাইরাসমুক্ত হতে চারদিনের বেশি সময় লাগতে পারে।

চিঠিপত্রের ব্যাপারে ভয়টা বেশ দৃশ্যমান। সেল বায়োলজিস্ট ও ভাইরোলজিস্ট ক্যারোলিন ম্যাকহেমার বলেন, তিনি এ বিষয়ে শতাধিক ই-মেইল পেয়েছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অনুচিত। নভেল করোনাভাইরাস কার্ডবোর্ড ও কাগজে খুব অল্প সময় বেঁচে থাকতে পারে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জডি ডিওনে-ওডাম বলেন, আমরা এখনো কোনো দেশে কাগজের চিঠিপত্র থেকে কভিড-১৯ সংক্রমণ হয়েছে তেমনটা দেখিনি। জডির মতে, চিঠিপত্র খোলা একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত কাজ। এখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকির পরিমাণ শূন্য।

স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন